সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

আন্দোলনে নাগরিক ভোগান্তি

জিম্মি করে দাবি আদায় গ্রহণযোগ্য নয়

রানিং স্টাফদের ধর্মঘটে গত মঙ্গলবার যেভাবে সারা দেশে একযোগে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, সেটা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। সুলভ ও নিরাপদ গণপরিবহন ট্রেনে প্রতিদিন আড়াই লাখের বেশি মানুষ যাতায়াত করেন। হঠাৎ ধর্মঘটে ট্রেনযাত্রীরা সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন। রেলসচিবসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পরিবহননেতাদের সঙ্গে ধর্মঘটী কর্মীদের দিনভর কয়েক দফা বৈঠক হলেও কোনো ফল আসেনি। শেষে রেল উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে দাবিদাওয়া মেনে নেওয়ার আশ্বাস পাওয়ার পর মধ্যরাতে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন তাঁরা।

রেলে বর্তমানে ২৫ হাজারের মতো জনবল থাকলেও ট্রেনের চাকা সচল রাখার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মীর সংখ্যা সব মিলিয়ে তিন হাজারের কাছাকাছি। ট্রেনচালক, সহকারী চালক, পরিচালক ও টিটিইরা রেলওয়ের রানিং স্টাফ বলে পরিচিত। তাঁরা কাজ না করলে ট্রেন চালানোর বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। ধর্মঘটের কারণে রানিং স্টাফদের দাবিদাওয়া আদায় হওয়ার পথ খুলল ঠিকই, কিন্তু দাবি আদায়ের পথ হিসেবে যেভাবে যাত্রীদের জিম্মি করা হলো, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হলো।

ধর্মঘটের ঘোষণা আগে থেকে হলেও মঙ্গলবার ট্রেন চলবে কি না, তা নিয়ে শেষ মুহূর্তেও অনিশ্চয়তা ছিল। সে কারণে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের আগে থেকে কিছু জানাতে পারেনি। স্টেশনে গিয়ে যাত্রীরা জানতে পারেন, ট্রেন চলবে না। রাজশাহীসহ কয়েক স্থানে বিক্ষুব্ধ যাত্রীরা ভাঙচুরও চালিয়েছেন। দু-একটা জায়গায় বিআরটিসি বাস দিয়ে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হলেও সিংহভাগ যাত্রীই চরম ভোগান্তিতে পড়েন। সুযোগ বুঝে বাসের ভাড়াও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এর পর থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নানা দাবি আদায়ে পথে নামছেন। প্রায় প্রতিদিনই আন্দোলনের কারণে ঢাকার কোনো না সড়ক বন্ধ থাকছে। দুর্ভোগে পড়ছেন নাগরিকেরা। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির নাজুক অবস্থা কিংবা সব নাগরিকের জীবনমানের উন্নতির প্রশ্নটি বিবেচনা না করেই গোষ্ঠীগত স্বার্থ চিন্তায় এখানে বেশি কাজ করছে। প্রথম আলো ৬ জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে জানায়, ৫ মাসে বঞ্চনা, বৈষম্যসহ নানা দাবিতে ১০১টি আন্দোলন হয়েছে। ফলে এ প্রশ্নও জোরালোভাবে উঠেছে যে সবার দাবি জানানোর এখনই উপযুক্ত সময় কি না।

রানিং স্টাফরা দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ করলে বেসিকের হিসাবে বাড়তি অর্থ পেতেন। এটিকে রেলওয়ের ভাষায় মাইলেজ বলে। এ ছাড়া অবসরের পর বেসিকের সঙ্গে এর ৭৫ শতাংশ অর্থ যোগ করে অবসরকালীন অর্থের হিসাব হতো। তবে ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর এই সুবিধা সীমিত করে অর্থ মন্ত্রণালয়। ব্যাপক যাত্রীচাহিদা থাকার পরও প্রতিবছর রেলওয়েকে বিপুল লোকসান গুনতে হয়। ব্যয় সংকোচনের সহজ পথ হিসেবে বিগত সরকার রানিং স্টাফদের সুবিধা হ্রাসের এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অথচ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া নেওয়া হয়েছিল একের পর এক অপরিকল্পিত প্রকল্প, যা রেলওয়ের লোকসানকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ট্রেন চলাচল বন্ধের পাশাপাশি আমরা দেখছি, শ্রমিকনেতা গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে খুলনায় ট্যাংকলরির শ্রমিকেরা ধর্মঘট পালন করলেন। তাঁদের ৬৬ ঘণ্টার ধর্মঘটের কারণে জ্বালানি তেল উত্তোলন ও পরিবহনে ব্যাঘাত ঘটে। বরিশাল থেকে ১৫ রুটে বাস চলাচল বন্ধ হওয়ায় যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।

এটা সত্যি যে বিগত সরকারের সময় তাঁদের ক্ষমতার সঙ্গে কিছু গোষ্ঠী ছাড়া আর সবার দাবিদাওয়া উপেক্ষণীয় থেকে গিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তাঁরা তাঁদের বঞ্চনা ও বৈষম্যের কথা জানাচ্ছেন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে যে কারোরই অধিকার আছে সরকারের কাছে তাঁদের দাবিদাওয়া জানানোর। কিন্তু তাই বলে জনভোগান্তি সৃষ্টি করে কিংবা নাগরিকদের জিম্মি করে দাবি আদায়ের কৌশল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।