তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সাম্প্রতিক সংকট, ভোক্তাদের দুর্ভোগ ও বাড়তি ব্যয় আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কৌশলগত পণ্যে একক উৎসে নির্ভরতা মোটেই টেকসই নীতি নয়। ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারঘোষিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলেও বাস্তবে বিক্রি হয়েছে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায়। বেশি টাকা দিয়েও অনেকে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে পারেননি। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ডিসেম্বরে চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৪০ শতাংশ কম আমদানি হওয়ায় এই সংকটের মূল উৎস। এ বাস্তবতায় এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ নিয়ে সরকারের নীতিমালায় পরিবর্তন আনা জরুরি বলেই আমরা মনে করি।
দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন। এর মধ্যে বিপিসি উৎপাদন করে মাত্র ১৯ হাজার টন। ফলে এ খাত পুরোটাই বেসরকারি খাতের আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ২৩টি কোম্পানির আমদানির সক্ষমতা থাকলেও ৫ থেকে ৬টি কোম্পানি মূলত আমদানি করে। ফলে বাজারে সব সময়ই চাহিদা ও জোগানের যেমন একটা ঘাটতি থেকে যায়, আবার বিভিন্ন পর্যায়ে সিন্ডিকেট তৈরির মাধ্যমে কারসাজি করে মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাও ঘটে। প্রতি মাসে বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে ভোক্তাদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়েই পণ্যটি কিনতে হয়।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জিটুজি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির অনুমতি চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বিপিসি বলেছে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজার স্থিতিশীল করার হাতিয়ার সরকারের নেই। আমরাও মনে করি, এলপিজিকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক খাতে পরিণত করার খেসারত দিতে হচ্ছে নাগরিকদের। এলপিজির বাজারে ভারসাম্য আনতে গেলে সরকারি পর্যায়েও আমদানির অনুমোদন দেওয়া প্রয়োজন।
দেশে এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় রান্নার কাজে, বাকি ২০ শতাংশ শিল্পকারখানায়। একসময় শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করলেও বর্তমানে গ্রামীণ পরিবারগুলোও এলপিজির ওপর অনেক মাত্রায় নির্ভরশীল। এ ছাড়া রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে ফুটপাতের খাবারের দোকানগুলোয়ও এলপিজি ব্যবহৃত হয়। ফলে এলপিজির মাত্রাতিরিক্ত দাম পরিবারগুলোর ওপর যেমন বাড়তি চাপ তৈরি করছে, একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়াচ্ছে। এমনিতেই টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে নানা কায়দা করে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে, এর ওপর এলপিজির দাম তাদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সরকারি পর্যায়ে এলপিজি আমদানির ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। বর্তমান সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে এলপিজি নিয়ে বড় সংকটে পড়তে না হয় এবং ভোক্তারা যাতে সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি না হন, তার জন্য এলপিজি আমদানির নীতিমালা পরিবর্তন জরুরি।
আমরা মনে করি, সরকারি পর্যায়ে শুধু এলপিজি আমদানি করাটাই যথেষ্ট নয়, সরবরাহের জন্য অবকাঠামো তৈরি করাটাও জরুরি। কেননা, আমদানি করে সরবরাহের দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে তাতে সিন্ডিকেটের কারসাজি কতটা বন্ধ হবে, তা নিয়ে বড় সংশয় থেকে যায়। এলপিজি আমদানি করে বিপিসি যাতে সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারে, সেই অবকাঠোমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়াটাও জরুরি।