সাংবিধানিক অধিকার হয়েও বাংলাদেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এখনো একটি দূরবর্তী লক্ষ্য হিসেবেই রয়ে গেছে। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, প্রতিবছর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে ৬১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা দেখায় যে স্বাস্থ্য খাত আর শুধু একটি সেবা খাত নয়, এটি দারিদ্র্য বৃদ্ধিরও বড় একটি উৎসে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা কেবল চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতায় থেমে নেই; এটি সরাসরি দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক অনিশ্চয়তাকে গভীর করছে।
স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় যখন সরাসরি মানুষের পকেট থেকে আসে, তখন সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবে অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ব্যয়ের হার দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনকভাবে বেশি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সেবা প্রতিষ্ঠানের সীমিত প্রস্তুতি, মানবসম্পদের ঘাটতি ও সেবার মান নিয়ে অনিশ্চয়তা। দেশের প্রায় অর্ধেক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় সেবা দিতে প্রস্তুত নয়—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাগত অবহেলার ফল।
স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটই এ সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বমান অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য যেখানে ৪৪ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশে আছে মাত্র ৮ জনের কিছু বেশি। এই ঘাটতি কেবল সংখ্যার নয়; দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও সুষম বণ্টনের অভাবও এতে যুক্ত। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য, সরকারি ও বেসরকারি খাতের অসামঞ্জস্য এবং শূন্য পদের দীর্ঘদিনের অবহেলা মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাত কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। টিকাদান ও যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ থাকলে ফল আসতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এসব কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। উন্নতির পরিসংখ্যান তখনই অর্থবহ, যখন তা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং নাগরিকের আস্থাকে শক্তিশালী করে।
আরও বড় সমস্যা হলো স্বাস্থ্য সুরক্ষার আলোচনায় প্রতিরোধমূলক দিকগুলোর অবহেলা। রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি, প্রাথমিক সেবা ও ওষুধ ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকলে চিকিৎসা ব্যয় কমবে না, দারিদ্র্যের চাপও হালকা হবে না। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে চিকিৎসার ঘাটতি দেখিয়ে দেয়—প্রতিরোধমূলক রোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ এখনো প্রস্তুত নয়।
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের জন্য নতুন করে সবকিছু শুরু করার প্রয়োজন নেই, কিন্তু প্রয়োজন রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও সমন্বিত সংস্কার। শূন্য পদ পূরণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আর্থিক সুরক্ষা জোরদার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়কে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ না করলে দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও বৈষম্যের এই চক্র ভাঙা যাবে না।