এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর বিচার চাওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। নরসিংদীর মহিষাশুড়া ইউনিয়নে ভয়াবহ এ ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্য দিয়ে আবারও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন ঘটল। প্রথমে ধর্ষণ, এরপর বিচার চাইতে গিয়ে হুমকি, এলাকা ছাড়ার চাপ এবং শেষ পর্যন্ত অপহরণ ও হত্যা। এই ধারাবাহিকতা দেখায়, দায়মুক্তির সংস্কৃতি কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ধর্ষণের ঘটনার পর পরিবারটি থানায় না গিয়ে স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্যের কাছে যায়। সেখানে ন্যায়বিচারের বদলে রফাদফা ও ধামাচাপার চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি উঠেছে। যদি তা সত্য হয়, তবে এটি শুধু নৈতিক ব্যর্থতা নয়, আইনের শাসনের পরিপন্থী আচরণ। জনপ্রতিনিধির ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল পরিবারকে আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে সহায়তা করা। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক সালিসের যে প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, তা অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
পুলিশের বক্তব্য, পরিবারটির থানায় আসা উচিত ছিল। আইনগতভাবে এই বক্তব্য সঠিক। তবে বাস্তব প্রশ্ন হলো, কেন মানুষ এখনো থানার চেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তির দ্বারস্থ হয়। এর উত্তর নিহিত রয়েছে আস্থার ঘাটতিতে। যদি মানুষ নিশ্চিত থাকত যে অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক মামলা নেওয়া হবে, নিরাপত্তা দেওয়া হবে এবং অপরাধীরা দ্রুত গ্রেপ্তার হবে, তাহলে তারা অনিশ্চিত সালিস প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিত না। বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব ও প্রভাবশালীদের প্রভাবের ধারণাই অপরাধীদের সাহস জোগায়।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যে মামলা হয়েছে এবং ইউনিয়ন বিএনপির এক নেতা ও তাঁর ছেলেসহ সাত আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু এখানেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রথমত, ধর্ষণের অভিযোগ কেন আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয়নি, কারা ধামাচাপায় ভূমিকা রেখেছে, পরিবারকে এলাকা ছাড়ার চাপ কে দিয়েছে, এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক দায়িত্ব।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নরসিংদীর ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, ভোলায় বাক্প্রতিবন্ধী গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ, হাতিয়ায় এক গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগসহ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখায়, এই দেশে নারী ও কিশোরীরা এখনো নিরাপদ নয়। আইন ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল থাকা সত্ত্বেও প্রতিরোধ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে আইনের কঠোরতা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
নরসিংদীর কিশোরীর মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বিচার চাইতে গিয়ে যদি জীবন দিতে হয়, তবে আইনের শাসন কার্যকর নয়। এই মামলার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত, জড়িত সবার জবাবদিহি এবং দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই হতে পারে ভুক্তভোগীদের কাছে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার পথ। ন্যায়বিচার কেবল একটি পরিবারের দাবি নয়, এটি সমাজের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির শর্ত।