বিদ্যালয় শুধু পাঠদানের ক্ষেত্র নয়, এটা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী ও আত্মমর্যাদাবান হিসেবে বেড়ে উঠতেও সহায়তা করে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করাটাও জরুরি। অপরিচ্ছন্ন শৌচাগারের কারণে শিক্ষার্থীরা যদি অস্বস্তি নিয়ে বিদ্যালয়ে যায়, সেটা তাদের শিক্ষাজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য।
সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার প্রতিবেদনে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শৌচাগারের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, সেটা শুধু অস্বাস্থ্যকরই নয়; উদ্বেগজনকও। দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২০ হাজার ২৫৮। এর মধ্যে গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৭৪০টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন মাউশির পরিদর্শকেরা। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ৫২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক ওয়াশব্লক নেই। আবার ১৪৬টিতে প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত পৃথক ওয়াশব্লক আছে আর ১৩১টি প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ওয়াশব্লক থাকলেও সেগুলো অপরিষ্কার। অর্থাৎ ৭৪০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩২৯টিতেই শৌচাগারের সংকট রয়েছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদক রাজধানীর মগবাজারের নয়াটোলায় একটি বিদ্যালয়ে সরেজমিন দেখেছেন, সেখানে ছেলে ও মেয়েদের একই শৌচাগার ব্যবহার করতে হয়। ঢাকাতেই যদি এমন বিদ্যালয় থাকে, তাহলে মফস্সল ও গ্রামীণ জনপদে বিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি যে আরও নাজুক, সেটা বলাই বাহুল্য। মাউশির কর্মকর্তারাই মনে করেন, প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে খারাপ।
মাধ্যমিক স্তরে একজন শিক্ষার্থীকে ছয় থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যালয়ে কাটাতে হয়। অপরিচ্ছন্ন ও যৌথ ওয়াশরুমে যেতে হবে বলে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় বিদ্যালয়ে থাকাকালে খাবার ও পানি খাওয়া কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া ছাত্রীদের পিরিয়ডের সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর। সব মিলিয়ে বিদ্যালয়ে শৌচাগারের সংকট শিক্ষার্থীদের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। বিদ্যালয়ে পৃথক ওয়াশরুম না থাকলে শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিয়মিত উপস্থিতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিদ্যালয়ে শৌচাগারের সংকটে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে ছাত্রীদের ওপর। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি, তার পেছনে নারীদের অগ্রগণ্য ভূমিকা রয়েছে।
আমাদের নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষার কথা বলে থাকেন। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশাল ঘাটতি রয়ে গেছে। এটা যতটা না অবকাঠামোগত সমস্যা, তার চেয়ে অনেক বেশি দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের জন্য পৃথক ও পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম নিশ্চিত করা শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যালয়ে শৌচাগারের এ সংকট দীর্ঘদিনের হলেও এটি নীতিনির্ধারণী স্তরে অনেকটাই অনালোচিত বিষয়। আমরা মনে করি, এ সংকট সমাধানের সবচেয়ে বড় উপায় হলো এটিকে সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এটি শুধু প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সচেতনতার ওপর নির্ভর করে না। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওয়াশব্লক নির্মাণ, পানির ব্যবস্থা করা, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজন সরকারের আলাদা বরাদ্দ এবং কার্যকর তদারকি।
মাউশির মহাপরিচালক পৃথক শৌচাগার না থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে পাঠানোর কথা বলেছেন। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে সরকার। আমরা মনে করি, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তালিকা প্রস্তুত করে পৃথক শৌচাগার নির্মাণ করা প্রয়োজন। শৌচাগার নিয়ে শিক্ষার্থীদের অস্বস্তি দূর করতেই হবে।