সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

টার্মিনালে ক্ষতি হবে সুন্দরবনের

জাহাজভাঙা শিল্পে কোনো আপস নয়

বিএনপি সরকার টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে দলটি পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু–সহনশীলতা বৃদ্ধিতে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কথা বলেছে। আশাবাদের জায়গা হলো, সম্প্রতি পরিবেশ রক্ষায় কিছু অঙ্গীকারের বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। এমনকি প্রথম আলোতে চকরিয়া সুন্দরবনের দুরবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিলীন হয়ে যাওয়া বনটি ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও আমরা জানতে পেরেছি।

তবে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া এমন দুটি সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনার সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে, যা তাঁদের ঘোষিত পরিবেশ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারছি, সরকার জাহাজভাঙা শিল্পকে ‘লাল’ শ্রেণি থেকে ‘কমলা’ শ্রেণিতে অবনমন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাহাজভাঙা শিল্পকে পরিবেশের জন্য সর্বোচ্চ দূষণকারী শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই শিল্প লাল শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম উপকূলে তা দীর্ঘদিন ধরেই মাটি, পানি এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে আসছে।

এই শিল্প কেবল যে প্রতিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে তা নয়, শ্রমিক তথা মানবস্বাস্থ্যের জন্যও এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গত ১২ বছরে এই শিল্পে ১৫০ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাই এর প্রাণঘাতী চিত্র তুলে ধরে। চলতি বছরের আগস্টেও ১০ জন শ্রমিক মারা যাওয়ার ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে এখনো তরতাজা। সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ঘাটতি ও অবহেলা পাওয়ার কথা জানিয়েছিল শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। এখন বিধিমালা শিথিল করে পরিবেশগত ছাড়পত্রের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ায় এবং প্রক্রিয়া সহজ করায় উপকূলীয় প্রতিবেশ ও শ্রমিকদের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।

অন্যদিকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব-ঐতিহ্য সুন্দরবনের ভেতরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সুন্দরবনের পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কায় রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনকালেও তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল ইউনেসকো। এখন আবারও এই স্পর্শকাতর এলাকায় এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন তৈরি হলে ড্রেজিং, অতিরিক্ত জাহাজ চলাচল, পোড়া তেল এবং রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।

নানা কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র এমনিতেই সংকটাপন্ন; এ–জাতীয় জ্বালানি অবকাঠামোর কারণে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সুন্দরবন আমাদের প্রধান প্রতিরক্ষাব্যূহ। ফলে এই বনের ক্ষতি সামগ্রিক জনপদের জন্যই এক মারাত্মক হুমকি।

পরিবেশ নিয়ে সরকারের ঘোষিত নীতি ও পরিকল্পনার সঙ্গে সাম্প্রতিক এই দুই উদ্যোগ মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেশের জন্য জরুরি। কিন্তু পৃথিবী আজ এমন এক স্পর্শকাতর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পরিবেশ ও জলবায়ুর প্রশ্নকে এড়িয়ে গৃহীত উন্নয়ন দীর্ঘ মেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনতে বাধ্য। নেপাল ও তিব্বতে সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার স্মৃতি আমরা এখনো ভুলিনি। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এখন যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলাকেই সবার আগে স্থান দেওয়া হচ্ছে।

 আমরা মনে করি, জাহাজভাঙা শিল্পের পরিবেশগত তদারকি শিথিল করার কোনো সুযোগ নেই। সুন্দরবন ও এর সংলগ্ন প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাও পুনর্বিবেচনা করে বিকল্প নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করতে হবে। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশবাদীদের মতামত গুরুত্বসহকারে নেওয়া উচিত। আমাদের প্রত্যাশা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা ও পরিবেশ সংরক্ষণে সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকবে।