হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রঘুনন্দন পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ৬০০ একরের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান বিচিত্র প্রজাতির গাছগাছালি ও জীবজন্তুর অভয়ারণ্য। প্রায় ২০০ প্রজাতির গাছের পাশাপাশি রয়েছে ১৯৭ প্রজাতির জীবজন্তু। পর্যটকদের কাছেও এই উদ্যান পরিবেশের সান্নিধ্য পাওয়ার অসাধারণ জায়গা বলেও বিবেচিত হয়। কিন্তু যে সাতটি পাহাড়ি ছড়ার কারণে এই বনের নামকরণ হয়েছিল এবং যে ছড়ার পানির কারণে এই বন এমন জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল, সেই ছড়ার অস্তিত্বই আজ বিলীনের পথে। ছড়া বিলীনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক জলাধারগুলোও ভরাট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় সাতছড়ির সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র গুরুতর হুমকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।
প্রথম আলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সাতটি ছড়ার মধ্যে চারটির অস্তিত্বই নেই, বাকি তিনটি দৃশ্যমান থাকলেও নেই পানির প্রবাহ। বালু ও পলিমাটিতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে বনের পুকুরগুলোও। বনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি এই জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া মানে কেবল যে প্রাণীদের খাদ্যের জোগানেরই সংকট নয়, বরং সামগ্রিকভাবেই পুরো বনের মধ্যে এর প্রভাব পড়বে।
কিন্তু এই প্রভাব এখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। খাদ্যের খোঁজে এবং তৃষ্ণা মেটাতে বিপন্ন প্রাণীগুলো চলে আসতে বাধ্য হবে লোকালয়ে। এতে শিকারিদের কবলে পড়ার ঝুঁকিও বাড়বে এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে প্রাণীদের সংঘাতের শঙ্কাও তৈরি হবে। আবার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হলে গাছগাছালিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থাৎ বনের জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া মানে পুরো প্রতিবেশব্যবস্থার শৃঙ্খল ভেঙে পড়া এবং পুরো অঞ্চলে নেতিবাচক প্রভাব পড়া।
বনের আশপাশের এলাকা থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন এবং এর ফলে সৃষ্ট ভূমিক্ষয় এই জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া অন্যতম কারণ বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এখনো দৃশ্যমান ছড়াগুলোর পানিপ্রবাহ ও জলাধারগুলোয় পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হওয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাতছড়ি বনের পুকুরগুলো সংস্কার করার পাশাপাশি বনের পরিবেশ ক্ষতি না করে আরও কয়েকটি পুকুর খনন করা দরকার। পুকুরগুলোর পাড় এমনভাবে ঢালু করা উচিত, যেন বিভিন্ন প্রাণী সহজেই পানির কাছে পৌঁছাতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে খেয়াল রাখা দরকার যে বিকল্প পানির উৎসের সন্ধান করতে গিয়ে যেন বনের স্বাভাবিক পরিবেশকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া না হয়। সাতছড়িকে বাঁচাতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের মতো যেসব কাজ দীর্ঘ মেয়াদে বনের প্রতিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সেগুলোকে পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।