সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

বন্য প্রাণী পাচার চক্র

শুধু চুনোপুঁটি নয়, রাঘববোয়ালদেরও ধরুন

পাহাড় ও বনাঞ্চল থেকে ক্রমে উধাও হয়ে যাচ্ছে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণী। বিভিন্ন সময় বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্ধার অভিযান দেখে মনে হতে পারে, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে তৎপরতা সচল রয়েছে; কিন্তু ভেতরের মূল চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এসব অভিযানে কেবল কিছু বাহক বা সামান্য অর্থের বিনিময়ে কাজ করা চুনোপুঁটিরা ধরা পড়ছে, অথচ নেপথ্যের আসল রাঘববোয়াল ও অর্থদাতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে কোনোভাবেই বন্য প্রাণী পাচার বন্ধ হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম ও পার্বত্য বনাঞ্চল থেকে শুরু করে ঢাকার মতো বড় শহরগুলোতে বন্য প্রাণী পাচারের যে বিস্তার ঘটেছে, তা পরিসংখ্যান ও নথিপত্র দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। বিগত বছরগুলোতে বিপুলসংখ্যক প্রাণী উদ্ধার ও ডজন ডজন মামলা হলেও বিচারে সাজা পাওয়ার হার নামমাত্র। অধিকাংশ মামলা বছরের পর বছর বিচারিক প্রক্রিয়ায় ঝুলে থাকায় অপরাধীদের মনে আইনের কোনো ভয় কাজ করছে না। এ ছাড়া বর্তমান আইনে বাঘ বা হাতি হত্যার ক্ষেত্রে কিছুটা শাস্তির বিধান থাকলেও অন্য যেকোনো দুর্লভ প্রাণীর ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত লঘু। ফলে একই ব্যক্তি একাধিকবার হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও দ্রুত আদালত থেকে জামিন পেয়ে আবার পুরোনো সিন্ডিকেটে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

সংঘবদ্ধ ও অত্যন্ত কৌশলী এই পাচারকারী চক্রের বিপরীতে আমাদের বন বিভাগের তদারকি ও তদারকিমূলক সক্ষমতা অত্যন্ত হতাশাজনক। দেশের বিশাল বনাঞ্চল ও সীমানার বিপরীতে রাজধানীভিত্তিক বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটে মাত্র কয়েকজন কর্মকর্তা কাজ করছেন। এ ছাড়া দেশের সামগ্রিক বন বিভাগেও আধুনিক প্রযুক্তি ও যানবাহনের চরম ঘাটতি রয়েছে। এত সীমিত জনবল ও সক্ষমতা নিয়ে কোটি টাকার আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র এবং সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ককে কাবু করা বাস্তবে অসম্ভব একটি বিষয়।

এই ভয়াবহ সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে যেকোনো বিরল প্রাণী পাচারের সাজা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে এবং অপরাধীরা যাতে সহজে জামিন না পায়, সে বিষয়ে করণীয় ভাবতে হবে। কেবল পথচলতি বাহক বা সংগ্রাহককে গ্রেপ্তার না করে মূল অর্থ জোগানদাতা ও পাচারকারীদের চিহ্নিত করে পুরো সিন্ডিকেট উপড়ে ফেলতে হবে। একই সঙ্গে বন বিভাগের জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং বিজিবি, পুলিশ ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মধ্যে যৌথ সমন্বয় জোরদার করতে হবে। সুন্দরবনে যেভাবে ধারাবাহিক পদক্ষেপে পাচার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল, পার্বত্য ও পূর্বাঞ্চলীয় বনাঞ্চলেও সেই পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই আমাদের ঐতিহ্যবাহী বনগুলো প্রাণী–শূন্য হয়ে যাবে।