সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

পৌরসভার অবৈধ উদ্যোগ

ঝালকাঠিতে জলাধার ভরাট থামাতে হবে

সরকারি কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান যখন নিজেই আইন অমান্যকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন দেশে সুশাসনের ক্ষেত্রে তা বড় ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অধিগ্রহণ করা একটি জলাধার ভরাট করে ঝালকাঠি পৌরসভা যেভাবে ট্রাকস্ট্যান্ড নির্মাণের কাজ শুরু করেছে, তা একাধারে বেআইনি ও চরম দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক।

প্রথম আলোর খবরে এসেছে, ঝালকাঠি শহরের বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন কৃষ্ণকাঠি মৌজায় সওজের জমিতে সাত লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। বিস্ময়কর বিষয় হলো, জমির মূল মালিক, সওজ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর—কারও কাছ থেকেই কোনো অনুমতি বা ছাড়পত্র নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি তারা।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গা ভরাট বা অন্য কোনোভাবে এর শ্রেণি পরিবর্তন করা সম্পূর্ণ বেআইনি। জলাধার আইনের লঙ্ঘন হলে কারাদণ্ড ও জরিমানার পাশাপাশি আইন অমান্যকারীর নিজ খরচে সেটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। অথচ একটি দায়িত্বশীল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হয়েও পৌর কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে আইন অমান্য করছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

পৌরসভার এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। হাইওয়ে মাস্টারপ্ল্যান ২০৪০ অনুযায়ী, বরিশাল-ঝালকাঠি-খুলনা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তখন এই জায়গার প্রয়োজন হবে। সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী লিখিতভাবে পৌর কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, ভূমি ব্যবহার নীতিমালা ২০১৫ অনুযায়ী, যথাযথ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো কাজে এ জায়গা ব্যবহারের আইনি সুযোগ নেই। তা সত্ত্বেও কার্যাদেশ পেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে দিয়েছে।

পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগের দাবি, শহরে একটি ট্রাকস্ট্যান্ড থাকা জরুরি হওয়ায় এমন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে এবং ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের’ সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু কোনো ‘জরুরি প্রয়োজন’-এর দোহাই দিয়ে অন্যের জমি বিনা অনুমতিতে ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করার এখতিয়ার পৌরসভার নেই। একটি বাসযোগ্য শহরের জন্য ট্রাকস্ট্যান্ডের পাশাপাশি জলাধারের উপস্থিতিও সমান জরুরি। পরিবেশ ধ্বংস করে ও আরেক সরকারি সংস্থার জায়গা গায়ের জোরে দখল করে উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না।

আমরা আশা করি, ঝালকাঠি পৌর কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে জলাধার ভরাটের এই বেআইনি কর্মকাণ্ড বন্ধ করবে। ইতিমধ্যে জলাশয়ের যতটুকু অংশ ভরাট করা হয়েছে, তা আইন অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের খরচে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি বা বেসরকারি—কোনো প্রতিষ্ঠানই যে আইনের ঊর্ধ্বে নয়, তা নিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তর ও সওজকে কঠোরভাবে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রেও জলাধারটির সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।