আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বলে আমরা মনে করি। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই গুলি করে হত্যা করা হয় রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আবু সাঈদকে। ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে গণ-অভ্যুত্থানে রূপান্তর এবং শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন অবসানের ক্ষেত্রে তাঁর নিহত হওয়ার ঘটনাটি ছিল একটি বাঁকবদলবিন্দু। পুলিশের বুলেটের সামনে দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়ানো আবু সাঈদের ছবি ও ভিডিও জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার সূচনা বক্তব্য থেকে রায় ঘোষণা পর্যন্ত ২৬৬ দিন সময় লেগেছে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এ ঘোষিত রায়ে পুলিশের সাবেক দুই সদস্যের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পুলিশের সাবেক আরও তিনজন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ মোট ২৮ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রংপুরের সাবেক পুলিশ কমিশনার এবং রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী, নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও রয়েছেন।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের সময় নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, মামলাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে ব্যাপক ও বিস্তৃত ঘটনা ঘটেছিল, তার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জাতির সামনে অবশ্যকরণীয় একটি কর্তব্য। অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় সেদিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। আমরা আশা করি, উচ্চ আদালত, আপিল বিভাগে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে এবং দোষী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, ‘আবু সাঈদ আশা করেছিলেন, তাঁর সামনে মানুষ; কিন্তু তাঁর সামনে মানুষ ছিল না। মানুষগুলো অমানুষ হয়ে গেছিল।’ একটি জবাবদিহিহীন স্বৈরাচারী কাঠামো যে কত মানুষকে ‘অমানুষে’ রূপান্তরিত করতে পারে, হাসিনার শাসনামল তার বড় দৃষ্টান্ত। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের সত্য অনুসন্ধান প্রতিবেদনে খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পুলিশসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সরকারদলীয় সংগঠনগুলোকে বিক্ষোভ দমাতে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আবু সাঈদসহ জুলাই অভ্যুত্থানে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁরা সবাই চেয়েছেন পুরোনো অগণতান্ত্রিক কাঠামো থেকে দেশকে বের করে আনতে। তাঁদের আত্মত্যাগ দেশকে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যাওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তবে একটি দৃষ্টান্তমূলক গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য পরিচ্ছন্ন নির্বাচনই শেষ কথা নয়। বরং পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামো পরিবর্তন করে আরও জবাবদিহিমূলক ক্ষমতাকাঠামো প্রতিষ্ঠা করাটাই সবচেয়ে বড় কাজ। সে ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, দুদক সংস্কার, পুলিশ সংস্কার, গুম প্রতিরোধের মতো রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার–সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ বাতিল করা ও এখনই বিল আকারে উপস্থাপন না করাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুরু হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হোঁচট খেল বলেই আমরা মনে করি।
হাসিনা সরকারের আমলে এবং জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তার প্রধান কারণ ছিল এসব বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। বলা চলে, এগুলোকে স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে অঙ্গীভূত করে ফেলা হয়েছিল। আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মতো দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হলে সরকারকে অবশ্যই পুলিশসহ সব বাহিনীকে জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
আমরা আশা করি, সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষার কথা মাথায় রেখে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, দুদক, পুলিশসহ রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারকে পুনর্বিবেচনা করবে।