নিপাহ ভাইরাস

আর কত প্রাণ গেলে ঘুম ভাঙবে প্রশাসনের

বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস এখন আর কেবল একটি মৌসুমি রোগ নয়; বরং এটি এক ভয়াবহ ও অপ্রতিরোধ্য প্রাণঘাতী সংকটে রূপ নিয়েছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সর্বশেষ তথ্য চমকে দেওয়ার মতো। গত দুই বছরে দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া শতভাগ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আগে যেখানে মৃত্যুহার ছিল ৭০ শতাংশের আশপাশে, এখন তা ১০০ শতাংশে পৌঁছানো মানেই হলো এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার অর্থই অবধারিত মৃত্যু। এই চরম বাস্তবতার পরও খেজুরের কাঁচা রস বিক্রি ও পানের উৎসবে লাগাম না টানা প্রশাসনিক ব্যর্থতারই নামান্তর।

বিশেষজ্ঞরা নিপাহ ভাইরাসের তিনটি নতুন ও ভীতিকর বৈশিষ্ট্যের কথা বলছেন। প্রথমত, আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুহারের এই চরম বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, নিপাহ ভাইরাসের ভৌগোলিক বিস্তৃতি। একসময় উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন এটি দেশের ৩৫টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে, এমনকি ভোলা বা শরীয়তপুরের মতো জেলাতেও রোগী শনাক্ত হচ্ছে। তৃতীয় এবং সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয়টি হলো, নিপাহ এখন আর কেবল শীতকালীন রোগ নয়। গত বছরের আগস্টে, অর্থাৎ ভরা গরমেও নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বাদুড়ের খাওয়া ফল (যেমন পেয়ারা) থেকেও যে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে, আগস্টের এ মৃত্যুর ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে তা দেখিয়ে দিয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে খেজুরের রস বিক্রির রমরমা প্রচার। কোনো কোনো বিক্রেতা দাবি করছেন, ‘নেট’ বা ‘জাল’ ব্যবহার করে বাদুড় ঠেকানো হচ্ছে বলে তাঁদের রস নিরাপদ। জনস্বাস্থ্যবিদেরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এটি একটি চরম ভ্রান্ত ধারণা। কারণ, বাদুড় যখন রস পান করে, তখন তার শরীর থেকে নিঃসৃত লালা বা মূত্র জালের ছিদ্র দিয়ে অনায়াসেই রসে মিশে যায়। ফলে কোনোভাবেই খেজুরের কাঁচা রস নিরাপদ করার কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

জনস্বাস্থ্যবিদেরা দীর্ঘকাল ধরে খেজুরের কাঁচা রস বিক্রি ও পানের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি জানিয়ে আসছেন। আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একমত হলেও অজ্ঞাত কারণে কঠোর কোনো আইন বা কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। যখন একটি রোগে মৃত্যুর হার শতভাগ, তখন সেখানে সচেতনতামূলক লিফলেট বিলি করাই যথেষ্ট নয়; বরং কাঁচা রস কেনাবেচা নিষিদ্ধ করে কঠোর শাস্তির বিধান করা সময়ের দাবি।

আমরা মনে করি, নিপাহ ভাইরাসের এই নতুন ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারকে অনতিবিলম্বে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। অনলাইন বা অফলাইন—সব মাধ্যমেই খেজুরের কাঁচা রসের বিজ্ঞাপন ও বিক্রি বন্ধ করতে হবে। মানুষের জীবনের চেয়ে কোনো ঐতিহ্য বা শখের পানীয় বড় হতে পারে না।