সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

অব্যাহত হামলা ও দখলচেষ্টা

মানুষের সম্পদ রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা কোথায়    

ঢাকার মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া, আদাবরে বাড়ি দখলের চেষ্টা এবং ইসিবি চত্বরে একটি হাউজিংয়ে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিওসহ কয়েকটি বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশে নৃশংস খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজির মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তার বিষয়টি এমনিতেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। এ প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা বাড়িঘরে হামলা সংঘবদ্ধ অপরাধের নতুন মাত্রা বলেই আমরা মনে করি।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মিরপুর ১–এ অবস্থিত রাড্ডা এমসি–এইচএফপি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে একদল দুর্বৃত্ত এক্সক্যাভেটর এনে গুঁড়িয়ে দেয়। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি যে হঠাৎ গজিয়ে উঠেছে এমন নয়; ১৯৭৪ সাল থেকে এটি সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দিয়ে আসছে।  

এ ঘটনায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার যে অভিযোগ উঠেছে, তাতে নেতা–কর্মীদের ওপর দলটির নিয়ন্ত্রণ কতটা, তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে অপরাধ প্রতিরোধ এবং নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয় ভূমিকা তাদের সক্ষমতা ও সদিচ্ছাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে খোদ রাজধানীতেই একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলাকারীরা তিন ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব ও লুটপাট চালালেও দুর্বৃত্তদের নিবৃত্ত করতে পুলিশ কোনো ভূমিকাই পালন করেনি। প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মেলায় শাহ আলী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আমরা মনে করি, নিরপেক্ষ তদন্ত করে পুলিশের এই নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কারণ খুঁজে বের করা এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই ভাসমান মানুষ, যারা টাকার বিনিময়ে এই ভাঙচুর ও লুটপাটে অংশ নেয়। ফলে এটা স্পষ্ট যে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালীদের ইন্ধনেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জায়গা দখলে নেওয়ার চেষ্টা চলেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি, একজন সংসদ সদস্যসহ যাঁদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত করে তাঁদের প্রত্যেককেই আইনের আওতায় আনতে হবে।

এ উদ্বেগজনক ও নজিরবিহীন ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে শনিবার রাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বরে একটি হাউজিংয়ে ঢুকে হামলা ও ভাঙচুর চালায় একদল দুর্বৃত্ত। কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদির তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ভাঙচুরের যে ভিডিও প্রকাশ করেন, তাতে দেখা যায় চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন আসবাব ও সরঞ্জাম ভাঙচুর করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এমন হামলা হয়েছে। অবশ্য পুলিশ দাবি করেছে, চাঁদাবাজি নয়; জমির বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। একই দিন সকালে রাজধানীর আদাবরে বাড়ি দখলের চেষ্টার খবর এসেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, চাঁদাবাজি হোক কিংবা জমির বিরোধ হোক, তাতে কি একদল দুর্বৃত্ত গিয়ে হামলা চালিয়ে নাগরিকের সম্পদ ধ্বংস করতে পারে? এখানে নাগরিকের সম্পদ রক্ষায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা কোথায়? 

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও মব সহিংসতা নাগরিক উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নাগরিকেরা প্রত্যাশা করেছিলেন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটবে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই তিনটি অগ্রাধিকার ঠিক করেছিল, এর একটি ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ঘোষণা দিয়েছিলেন মব সহিংসতার দিন এখন শেষ। তাহলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া কিংবা বাড়িঘরে হামলাকে আমরা কী বলে সংজ্ঞায়িত করব? 

 প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে সাত মাস পর এসেও পুলিশকে কেন কার্যকর ভূমিকায় দেখা যাবে না? আমরা মনে করি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া, বাড়ি দখলের চেষ্টার মতো সংঘবদ্ধ অপরাধ এখনই বন্ধ না করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।