ঢাকা শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে অপরিকল্পিত ও অবাসযোগ্য শহরগুলোর একটি।
গত বুধবার একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে রাজউকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির কথা ও কাজের অসংগতির বিষয়টি উঠে আসে। প্রকৌশলী ইকবাল হাবিব প্রশ্ন তুলেছেন, ঢাকা শহরের ৯৫ শতাংশ ভবনই অবৈধ। ভবন নির্মাণে যদি এই স্বেচ্ছাচারিতা চলতে থাকে, তাহলে রাজউকের প্রয়োজন কী?
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, রাজউকের যে সক্ষমতা আছে, তা দিয়ে বাসযোগ্য ঢাকা করা সম্ভব নয়। রাজউকের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিয়া এর উত্তরে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা খোঁড়া যুক্তিই বটে। তিনি বলেছেন, ঢাকা শহরে যত মানুষ আসবে, রাজউক তাদের জন্য পরিকল্পিত শহর দেবে—এটা ভাবা অকল্পনীয়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, রাজউকের কাজ কী? রাজউক তো ঢাকা ছাড়িয়ে পূর্বাচলেও তাদের পরিধি বাড়িয়েছে। এই পরিধি বাড়ানোর সঙ্গে সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকলে যা হয়, সেটাই রাজউকের ক্ষেত্রে হয়েছে। তারা এক যুগ আগে ড্যাপ বা ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান হাতে নিয়েও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বারবার এই নীতি পরিবর্তন করেছে স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে।
রাজউকের চেয়ারম্যান অবশ্য দুর্নীতির দায় কিছুটা প্রকৌশলীদের ওপর চাপিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভাষায়, ভবন নির্মাণে যে অনিয়ম হয়, সেখানে প্রকৌশলীদেরও দায় আছে। প্রশ্ন হলো, ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে কোনো প্রকৌশলী অনিয়ম করলে তা তদারকির দায়ও তো রাজউকের। তারা তা করতে পারছে না কেন? দায় রাজউককেই নিতে হবে। যেমন রাজউকের ব্যর্থতা ও অনিয়মের দায় মন্ত্রণালয় তথা সরকারের ওপরই বর্তায়।
বৈঠকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম ড্যাপ আইনে ১ থেকে ৫ শতাংশ ত্রুটি থাকার কথা উল্লেখ করে কেবল নেতিবাচক বিষয় সামনে না আনার পরামর্শ দিয়েছেন। ইতিবাচক কাজের মধ্য দিয়েই নেতিবাচক বিষয়কে পেছনে ফেলা যায়। কথার ফুলঝুরি ছুটিয়ে বা ব্যর্থতা আড়াল করে নয়। রাজউকের কাজকর্ম নিয়ে বহু বছর ধরেই গুরুতর অভিযোগ এসেছে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো কার্যকর তদন্ত না হওয়া কিংবা দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
গোলটেবিল বৈঠকে ভবন নির্মাণে ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআর নিয়েও আলোচনা হয়। এ ব্যবস্থায় রাস্তার প্রশস্ততা ও নাগরিক সুবিধার ভিত্তিতে ভবনের উচ্চতা অনুমোদনের যে বিধান রাখ হয়েছে, তা নীতি হিসেবে ভালো। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেটা মেনে চলা হয় কি না, তা দেখার দায়িত্ব রাজউককেই নিতে হবে। অন্যথায় ‘কাজির গরু গোয়ালে নেই কেতাবে আছে’র অবস্থা তৈরি হবে।
সব মানুষ ঢাকায় যাতে না আসে, সে জন্য সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকতে হবে। যেসব কারণে সব ঢাকামুখী জনস্রোত তৈরি হয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণ কেবল মুখে বললে হবে না; কাজ করে দেখাতে হবে। রাজধানী শহরে সচিবালয় থাকতে পারে; কিন্তু সব সরকারি দপ্তর ও বিভাগের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় হতে হবে কেন?
ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে অবশ্যই এর ওপর মানুষের চাপ কমাতে হবে। ঢাকার চাপ কমাতে সরকার পূর্বাচলে যে নতুন উপশহর নির্মাণ করেছিল, তা-ও চালু করা যাচ্ছে না যথাযথ অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা না থাকায়।