নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই যুদ্ধ বন্ধের জন্য স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা গোটা বিশ্বের জন্যই স্বস্তির খবর। উন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭-এর শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব স্বাক্ষর করায় নিঃসন্দেহে এই সমঝোতা স্মারকের গুরুত্ব অনেক বেশি। তবে সতর্কতার বিষয় হলো, টেকসই ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে যে দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ, এটি তার প্রথম ধাপ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে যুদ্ধ ও সংঘাত শুরু হয়েছিল, সাময়িক যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও তা ১০০ দিনের বেশি সময় স্থায়ী হয়। আধুনিক ড্রোন, মিসাইল, যুদ্ববিমাননির্ভর এই যুদ্ধ আবারও প্রমাণ করেছে, যুদ্ধ কতটা ধ্বংসাত্মক ও এর প্রভাব কতটা বৈশ্বিক হতে পারে। পাল্টাপাল্টি হামলায় জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম বড় রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বাংলাদেশসহ প্রায় গোটা বিশ্বে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, নিত্যপণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে। নতুন মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সরকারগুলোকে চাপে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সমঝোতা স্মারক যে গোটা বিশ্বের জন্য কতটা প্রত্যাশিত ছিল, প্রাথমিক শান্তিচুক্তির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে আসা এবং দেশে দেশে শেয়ারবাজারের উত্থান তার প্রমাণ দেয়। ওয়াশিংটন-তেহরান সমঝোতা স্মারকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার কথা বলা রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের ওপর থেকে নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে আলোচনার সময় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি নিয়ে কাজ করা হবে বলে প্রত্যাশার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধ একপর্যায়ে অচলাবস্থায় রূপ নেয় এবং দুই পক্ষই বেরিয়ে আসার পথ খোঁজে। সমঝোতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তান যে কূটনৈতিক ভূমিকা রাখে, নিঃসন্দেহে সেটা প্রশংসনীয়। সমঝোতা স্মারকে সই হওয়ার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে। তবে বাস্তবতা হলো, মাইন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক পথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ অচলাবস্থা তৈরি করে। আশাবাদের জায়গা হলো, ট্রাম্প-পেজেশকিয়ান সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ায় এক দিনের মাথায় সুইজারল্যান্ডে মধ্যস্থতাকারী কাতার, পাকিস্তানসহ যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আলোচনায় বসছে। আমরা আশা করি, সব পক্ষ শুভবোধের পরিচয় দেবে এবং নিজ দেশের জনগণ ও বিশ্ববাসীর বৃহত্তর স্বার্থে ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী ও টেকসই শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
বড় এই আশাবাদের মধ্যে বড় শঙ্কার জায়গাটাও সমানভাবে বিদ্যমান। গত কয়েক দশকে ইসরায়েলের বেপরোয়া ভূমিকা ও আগ্রাসন মধ্যপ্রাচ্যকে বারবার করে অশান্তি ও সংঘাতের বৃত্তে ঠেলে দিয়েছে। গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ ও আধুনিক ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা সংঘটিত করার পর ইসরায়েল এখনো লেবাননে আগ্রাসন, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা জারি রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও ইরান যুদ্ধে টেনে নিয়ে আসেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতার পরও লেবাননে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। গণহত্যা, আগ্রাসন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ নেতাদের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করা গেলে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো শান্তি প্রক্রিয়াই টেকসই হবে না।