সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

আকাশছোঁয়া ভবন 

ঢাকায় বাসযোগ্যতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কেন

আবাসন ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে সরকার ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধন করে বেশির ভাগ এলাকায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে ঢাকার জনবহুল অঞ্চলে আকাশচুম্বী ভবনের সংখ্যা আরও বাড়বে। নগর–পরিকল্পনাবিদদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও নেওয়া এই সিদ্ধান্ত ঢাকার টেকসই উন্নয়নকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এটি কেবল কিছু আবাসন ব্যবসায়ীর মুনাফা বাড়াবে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি কুফল ভোগ করতে হবে দুই কোটির বেশি নগরবাসীকে।

এফএআর হলো জমির ওপর ভবনের মোট মেঝের অনুপাত। এটি বাড়লে একটি নির্দিষ্ট জমিতে অনেক বেশি তলা নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, খিলক্ষেতে এখন যেখানে পাঁচতলা ভবন বানানো সম্ভব, নতুন নিয়মে সেখানে নয়তলা ভবন বানানো যাবে। আপাতদৃষ্টে এটি আবাসন সমস্যা সমাধানের একটি সহজ উপায় মনে হতে পারে, কিন্তু এর বাস্তবিক পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

ঢাকা এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। তীব্র যানজট, অপর্যাপ্ত নাগরিক পরিষেবা এবং বর্ষায় জলাবদ্ধতা এখানকার নিত্যদিনের সমস্যা। এফএআর বাড়ালে একই স্থানে আরও বেশি মানুষ বসবাস করবে, যা শহরের অবকাঠামোর ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি করবে। পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পয়োনিষ্কাশন—সব ধরনের ইউটিলিটি পরিষেবা আরও সংকটে পড়বে। সড়কের ওপর চাপ বাড়ায় যানজট আরও তীব্র হবে এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। অতিরিক্ত উঁচু ভবনের কারণে আলো ও বাতাসের চলাচল কমে যাবে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

ড্যাপ-২০২২ তৈরি হয়েছিল ঢাকার অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন ঠেকাতে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্বাচলকে উত্তরা বা মিরপুরকে বাড্ডার মতো জনঘনত্বের এলাকা হতে না দেওয়া। কিন্তু আবাসন ব্যবসায়ীদের প্রবল চাপ ও লবিংয়ের মুখে সেই উদ্দেশ্যই এখন ব্যাহত হচ্ছে। নগর–পরিকল্পনাবিদদের আপত্তি সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা প্রমাণ করে জনস্বার্থের চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত একধরনের আত্মঘাতী পদক্ষেপ। এটি এমন এক ভবিষ্যৎকে নির্দেশ করে, যেখানে ঢাকা আরও বেশি বাসযোগ্যতা হারাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল, তারা নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনবে এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে সেই প্রত্যাশা হতাশায় পরিণত হয়েছে।

সরকারের উচিত অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা। নগর–পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ মানুষের উদ্বেগগুলোকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা দরকার। কেবল ব্যবসায়িক চাপ বা মুনাফার লোভে একটি শহরের ভবিষ্যৎকে এভাবে বিপন্ন করা যায় না। ঢাকা যদি এখনো কিছুটা বাসযোগ্য শহর হিসেবে টিকে থাকতে চায়, তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণের রাশ টেনে ধরতে হবে।