সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

সারের সিন্ডিকেট

কৃষকের দুর্দশা ঘোচাতেই হবে

সরকার আসে, সরকার যায়; সারের সিন্ডিকেট থেকে মুক্তি নেই কৃষকের। বোরো চাষ সামনে রেখে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে বরিশালের চাষিদের। ফলে সারের চড়া দাম, সেচ, কীটনাশকের আকাশছোঁয়া ব্যয় ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে কৃষকেরা এখন আবাদ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত লোকসান নয়, বরং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত।

সরকারি হিসাবে সারের কোনো সংকট নেই। বিএডিসি বলছে, গুদামে সার রাখার জায়গা পর্যন্ত নেই। অথচ মাঠপর্যায়ে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকার নির্ধারিত এক বস্তা ইউরিয়া সারের দাম ১ হাজার ২৫০ টাকা হলেও কৃষকদের গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৪৬০ টাকা। ডিএপি সারের ক্ষেত্রেও চিত্র একই—বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। এই অতিরিক্ত মুনাফা কার পকেটে যাচ্ছে? কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা সারের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন।

কেবল সার নয়, বোরো আবাদে ডিজেল ও কীটনাশকের দামও এখন নাগালের বাইরে। পাম্প থেকে সরাসরি ডিজেল না পাওয়ায় বাইরে থেকে চড়া দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। তিন-চার বছরে কীটনাশকের দাম বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্রমিকের চড়া মজুরি। সব মিলিয়ে এক একর জমিতে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে সমপরিমাণ টাকার ধান ঘরে উঠবে কি না, তা নিয়ে কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। লাভ না হওয়ায় অনেকে পৈতৃক পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন বা আবাদের পরিধি কমিয়ে শুধু নিজের খাওয়ার জন্য চাষ করছেন।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য। বিএডিসি বলছে, দাম দেখার দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের। আবার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বলছে যে তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগতই নয়! এই দায় এড়ানোর সংস্কৃতিই অসাধু ব্যবসায়ীদের সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু তা–ই নয়, সংশ্লিষ্ট এসব কর্তৃপক্ষের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অসাধু কর্মকর্তারাও এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ আছে।

নতুন সরকারের কাছে আমরা আশা করব, যেভাবেই হোক এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। বোরো মৌসুম আমাদের প্রধান দানাদার শস্যের বড় উৎস। কৃষকদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে যাঁরা পকেট ভারী করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং, প্রতিটি ডিলার পয়েন্টে সরকারি মূল্যের তালিকা টাঙানো এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষি খাতে সরকার যে ভর্তুকি দিচ্ছে, সেটির সুফল কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতেই হবে। কৃষকদের দীর্ঘশ্বাস যদি সরকারের নীতিনির্ধারকদের কানে না পৌঁছায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে চালের বাজারে অস্থিরতা ও খাদ্যঘাটতি এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।