নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা

সমঝোতার সুযোগ এখনো নষ্ট হয়নি 

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৭ জানুয়ারি ভোট গ্রহণ। নির্বাচন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চরম বিরোধপূর্ণ একটি পরিস্থিতির মধ্যেই এই তফসিল ঘোষণা করা হলো।

বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে দেওয়া ভাষণে সিইসি বলেছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৭ ডিসেম্বর। প্রতীক বরাদ্দ ১৮ ডিসেম্বর। ৩০০ আসনেই কাগজের ব্যালটে ভোট গ্রহণ করা হবে।

২০১৪ ও ২০১৮ সালে পরপর দুটি জাতীয় নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একে গ্রহণযোগ্য করা। সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমেই তা সম্ভব। প্রত্যাশা ছিল এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্বাচন নিয়ে দুটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে, যার কোনো মীমাংসা হয়নি।

এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের যে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে, তা সবার প্রত্যাশিত অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনাকে কার্যত অসম্ভব করে তুলেছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে হয়তো সরকারি দলের প্রত্যাশা অনুযায়ী সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যাবে, কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা যাবে না।

বলা যায়, নির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনীতিতে এক সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিরোধী দলের ডাকে এখন দেশব্যাপী অবরোধ চলছে। এসব কর্মসূচিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সহিংসতা ও গাড়ি পোড়ানোর মতো ঘটনা ঘটেছে।

অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, সংগঠকসহ নেতা-কর্মীদের নামে মামলা ও ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। 

তফসিল ঘোষণার ভাষণে সিইসিও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, মতভেদ থেকে সংঘাত ও সহিংসতা হলে তা থেকে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় বিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তিনি মতৈক্যের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। কমিশনের পক্ষ থেকে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি তিনি যে আহ্বান জানিয়েছেন, তাকে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। তিনি বলেছেন, ‘আমি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সকল রাজনৈতিক দলকে বিনীতভাবে অনুরোধ করব, সংঘাত ও সহিংসতা পরিহার করে সদয় হয়ে সমাধান অন্বেষণ করতে।’

সিইসি আশাবাদ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘পারস্পরিক প্রতিহিংসা, অবিশ্বাস ও অনাস্থা পরিহার করে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা ও সমাধান অসাধ্য নয়।’ বোঝা যায়, নির্বাচন প্রশ্নে একটি সমঝোতার ব্যাপারে তিনি আশা ছাড়েননি। আমরাও মনে করি, কোনো রাজনৈতিক সংকটই সমাধানের অযোগ্য নয়। আর গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে যেকোনো মতপার্থক্য, বিরোধ মীমাংসার একমাত্র পথ হচ্ছে আলাপ-আলোচনা ও সংলাপ। 

অবাধ, নিরপেক্ষ ও সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও সংঘাত-সহিংসতা পরিহারের জন্য রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই। তফসিল ঘোষণার পরও সেই সুযোগ রয়েছে বলে আমরা মনে করি। সিইসি যেহেতু সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতার ব্যাপারে আশাবাদী, তাই আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশন এ ধরনের উদ্যোগের সূত্রপাত করতে পারে। তবে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টিসহ এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের উদ্যোগ ও ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর বিরোধী দলকেও সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।