সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ঊর্ধ্বমুখী আলু 

উৎপাদন বেশি হলে দাম এত বাড়বে কেন

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যখন বাজার নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, তখনই প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এর মধ্যে আলুর দাম রেকর্ড ছাড়িয়েছে। 

প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি নতুন ও পুরোনো আলু বিক্রি হয় ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে আলুর দাম কেজিতে অন্তত ১০ টাকা বেড়েছে। গত বছরের এই সময়ে আলুর দাম ছিল প্রতি কেজি ১৬ থেকে ২২ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আলুর দাম ২২ টাকা থেকে ৮০ টাকায় ওঠার কী কারণ থাকতে পারে? 

টিসিবির বাজারদর অনুযায়ী, ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম এখন ৪৮-৫০ টাকা। মাঝারি চাল পাওয়া যায় ৫০-৫৫ টাকায়। আর প্রতি কেজি সরু চালের দাম পড়ছে ৬০-৭৫ টাকার মধ্যে। ফলে সব ধরনের মোটা ও মাঝারি চালের চেয়ে আলুর দাম এখন বেশি পড়ছে। এর অর্থ এক কেজি চালের চেয়ে এক কেজি আলুর দাম বেশি। একটা সময় দেশে মানুষকে ভাতের বিকল্প হিসেবে আলু খেতে হয়েছে। আলুর দাম কম থাকায় সে সুযোগ ছিল। এখন আর সেই সুযোগ নেই। 

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে আলুর দাম কমতে শুরু করে। তবে এবার আলুর আগাম ফলন কিছুটা ব্যাহত হওয়ায় এর দাম কমছে না।

উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণ কি গত বছর কৃষকের ন্যায্য দাম না পাওয়া? সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, সরকার তাঁদের ন্যায্য দাম পাইয়ে দিতে কি কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে? আলুর দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের তেমন লাভ হয়নি। কেননা মার্চ–এপ্রিলের মধ্যেই তাঁরা আলু বিক্রি করে দিয়েছেন হিমাগারমালিকদের হাতে। 

এসব থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে সিন্ডিকেট কেবল কয়েকটি আমদানি করা খাদ্যপণ্যে নয়, দেশে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যেও এর দৌরাত্ম্য লক্ষ করছি সমানভাবে। প্রথমত আলু কিংবা অন্য পণ্যের দাম ক্রেতাদের নাগালের বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত সরকারের হুঁশ হয় না। পরে পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তারা লোকদেখানো কিছু পদক্ষেপ নিলেও সেটি কাজে আসে না। এবার সরকার আলুর দাম বেঁধে দিয়েও বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এমনকি যে পরিমাণ আলু আমদানি করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তা–ও আনা সম্ভব হয়নি। 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত মৌসুমে আলু উৎপাদিত হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখ টন। আবার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, আলু উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১১ লাখ টন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, আলু উৎপাদিত হয়েছিল ১ কোটি ৯ লাখ টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবমতে, দেশে বছরে আলুর মোট চাহিদা ৮০ থেকে ৮৫ লাখ টন। চাহিদার চেয়ে যদি উৎপাদন বেশিই হবে, তাহলে আলুর দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ল কেন? এই প্রশ্নের জবাব কে দেবেন? 

 দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বিপণনব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও কৃষকবান্ধব করতে পারলে ফড়িয়া, মজুতদার ও হিমাগারমালিকেরা ভোক্তাদের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিযে নিতে পারতেন না। আশা করি, বিলম্ব হলেও কৃষক ও ভোক্তাদের উদ্বেগটি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।