সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

শ্রীমঙ্গল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ দিন

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়েছে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে, কিন্তু এসে শুনলেন এখানে গাইনি ডাক্তার নেই, অগত্যা ঝরে পড়ল খেদ, ‘আমরা গরিব মানুষ, বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে কীভাবে চিকিৎসা করাব?’ নাগরিকের এই খেদোক্তি নিঃসন্দেহে যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই দুঃখজনক, কিন্তু এই ডাক্তার না থাকার যে কারণ সাম্প্রতিক প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাতে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের প্রশাসনিক দুর্বলতাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

২০১২ সালে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করে কার্যক্রম শুরু হলেও উপযোগী জনবল এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ২২০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে শূন্য পদ রয়েছে ৬৭টি। চিকিৎসকের ৪১টি পদের মধ্যে ২৫টিই শূন্য; নেই প্রসূতি ও অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ। জনবলের অভাবে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে না। একজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট দিয়ে সামলাতে হচ্ছে পুরো প্যাথলজি বিভাগ।

জীবন-মরণের মুখোমুখি হয়ে মানুষ হাসপাতালে যায়, যেখানে সামান্য বিলম্বই মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই চিকিৎসাসেবা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় লোকবলের এই চরম ঘাটতি কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক সংকট নয়, বরং নাগরিকদের জন্য এক গভীর উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।

সরকারি হাসপাতালে স্বাভাবিক চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ায় একটা আর্থিক চাপও পড়ে স্থানীয়দের ওপর, বিষয়টি মোটেও উপেক্ষা করা উচিত নয়।

এই হাসপাতালে স্থানীয় বিভিন্ন চা-বাগানের দরিদ্র রোগীরাও আসে। কিন্তু প্রায়ই তাদের জেলা হাসপাতালে পাঠাতে হয় অথবা বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালের দিকে ভিড়তে হয়, যা সামগ্রিকভাবে আর্থিক চাপও তৈরি করে।

স্বাস্থ্য খাতের এই ধরনের জনবলসংকট কেবল একটি হাসপাতালের বিষয় নয়। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত ৪১ হাজার ৮০৬টি পদের বিপরীতে শূন্য পদের সংখ্যা ১১ হাজার ৪৯৫ (প্রথম আলো, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। এই তথ্য থেকে স্বাস্থ্য খাতে জনবলসংকটের তীব্রতা বুঝতে পারি। কিন্তু শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যে ১৪ বছরেও নিয়োগ সম্পন্ন হলো না, এতে বাংলাদেশের উন্নয়নের একটা প্রবণতাও স্পষ্ট হয়। ফলে আমরা এই প্রশ্ন উত্থাপন না করে পারি না, উপযুক্ত জনবল নিয়োগ না দিয়ে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে আদৌ নাগরিকের সুফল হয় কি না।

প্রতিবেদন থেকে জানতে পারছি, জনবল চেয়ে একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি ভিত্তিতে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবিলম্বে শূন্য পদগুলোতে চিকিৎসক, কনসালট্যান্ট এবং প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিতে হবে। মনে রাখা দরকার, আমাদের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে ভরসার জায়গা হচ্ছে সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো।