সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

টঙ্গীতে শ্রমিকদের অসুস্থতা

নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করুন

গাজীপুরের টঙ্গীতে একের পর এক পোশাকশ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা গভীর উদ্বেগের। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, দুই দিনের ব্যবধানে টঙ্গীর একই কারখানার শতাধিক শ্রমিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বিষয়টি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি কেবল একটি কারখানার স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রশ্ন নয়, বরং দেশের তৈরি পোশাক খাতের কর্মপরিবেশ, শ্রমিক সুরক্ষা ও তদারকির দুর্বলতার প্রতিফলন।

পোশাক খাত বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকা শক্তি। এই খাতের ওপর নির্ভর করে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা। অথচ সেই খাতেই বারবার এমন ঘটনা ঘটছে। শ্রমিকেরা কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় একটি শিল্পে শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশ কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অসুস্থ শ্রমিকদের উপসর্গের মধ্যে রয়েছে বমি, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা ও অস্বস্তি। এগুলো একত্রে দেখলে পরিবেশগত কোনো ঝুঁকি, রাসায়নিক গ্যাস, বায়ু চলাচলের সমস্যা অথবা মানসিক চাপের বিষয়টি সামনে আসে। বিশেষ করে এর আগে বেতন বকেয়ার দাবিতে আন্দোলনের সময়েও একই ধরনের অসুস্থতার ঘটনা ঘটেছিল। ফলে কেবল শারীরিক কারণ নয়, কর্মপরিবেশের চাপ, উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

দুঃখজনক হলো, এমন ঘটনার পরও প্রায়ই আমরা শুনি, ‘তাৎক্ষণিক কারণ জানা যায়নি’, ‘তদন্ত চলছে’। কিন্তু তদন্তের ফল কী হলো, দায় কার, ভবিষ্যতে কীভাবে এমন ঘটনা ঠেকানো হবে, সে বিষয়ে খুব কমই স্পষ্ট তথ্য সামনে আসে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ে, মালিকপক্ষের ওপর আস্থা কমে এবং সামগ্রিকভাবে শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথম দায়িত্ব কারখানা কর্তৃপক্ষের। কর্মস্থলে বায়ু চলাচল, রাসায়নিক ব্যবহারের নিরাপত্তা, আগুন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা জরুরি। পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি সময়মতো পরিশোধ করা, তাঁদের অভিযোগ শোনার ব্যবস্থা রাখা এবং মানসিক চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। শ্রম অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নিয়মিত ও কার্যকর পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। কাগজে–কলমে নয়, বাস্তব পর্যায়ে তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অসুস্থতার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।

পোশাকশ্রমিকেরা কেবল উৎপাদনের যন্ত্র নন। তাঁরা মানুষ। তাঁদের সুস্থতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এই খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। টঙ্গীর ঘটনাটি যেন আরেকটি উপেক্ষিত সংখ্যায় পরিণত না হয়। এটি হোক শ্রমিক নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের জন্য একটি সতর্কবার্তা।