সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্র

দোষী ব্যক্তিদের ধরুন, বিচার করুন

মিরপুর ১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে তাণ্ডবের ঘটনাটি শুধু একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর নয়; এটি জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মুখোশ পরা ২০০ থেকে ২৫০ ব্যক্তি দেশি অস্ত্র নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে। তারা মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, টিকা, নগদ টাকা ও অন্যান্য সামগ্রী লুট করে। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা, তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। মামলার এজাহার অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এমন তাণ্ডবের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর সক্রিয় ভূমিকা দৃশ্যমান নয়।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষকে মাতৃ ও শিশুসেবা দিয়ে আসছে। সেখানে প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা, শিশুদের টিকাদান ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা ছিল। তিনটি স্থায়ী ক্লিনিকেও নানা চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো।

এখন সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে ত্রিপল টানিয়ে শিশুদের টিকা দিতে হচ্ছে। খোলা জায়গায় টেবিল-চেয়ার বসিয়ে চলছে টিকাদান। গরমে মায়েরা শিশুদের নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছেন। নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের বদলে কয়েক মাস বা কয়েক বছর বয়সী শিশুদের রাস্তাঘেঁষা অস্থায়ী ব্যবস্থায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবাও বন্ধ। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা কোনোভাবে শুধু টিকাদান চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রশ্ন হলো, এত বড় ঘটনা ঘটল কীভাবে? ২০০ থেকে ২৫০ জন অস্ত্রধারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রাখল, মালামাল লুট করল এবং ভারী যন্ত্রপাতি এনে ভবন গুঁড়িয়ে দিল। এটি আকস্মিক কয়েক মিনিটের ঘটনা নয়। এত লোকের সমাগম, লুটপাট ও স্থাপনা ধ্বংসের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

কর্মকর্তারা বলেছেন, কয়েক বছর ধরে একটি সমবায় সমিতির নামে কিছু লোক জায়গাটি দখলের চেষ্টা করছিলেন। স্থানীয় সূত্রগুলো স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষের মধ্যে জায়গাটি নিয়ে বিরোধের কথাও জানিয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম একটি পক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এসেছে। তিনি সমিতির সঙ্গে তাঁর যুক্ততার কথা স্বীকার করলেও ভাঙচুরে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে তদন্তের কথা বলেছেন।

জায়গা নিয়ে বিরোধ থাকলে তার সমাধান আদালতে হবে। মালিকানার দাবি নথি, আইন ও আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে; অস্ত্রধারী লোকজন এনে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস করে নয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানও বলেছেন, জায়গা বা স্থাপনা নিয়ে বিরোধ আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করতে হবে।

আমরা মনে করি, দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং প্রমাণ সাপেক্ষে আইনের আওতায় আনা জরুরি। তা না হলে জনমনে বার্তা যাবে—দলবল, অস্ত্র ও প্রভাব থাকলে জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানও দখল ও ধ্বংস করা যায়। এমন বার্তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও দুর্বল করবে এবং দখলদারদের বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ করে দেবে।