পুলিশ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা

মাদক নিয়ন্ত্রণে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে  

ঢাকার সাভারের আমিনবাজারে ছেলের পোশাক কারখানায় ঢুকে যেভাবে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেটা শুধু উদ্বেগজনক ঘটনাই নয়; নাগরিক নিরাপত্তাহীনতারও বড় দৃষ্টান্ত। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, এক প্রবীণ ব্যক্তিকে মারধরের প্রতিবাদ করায় শনিবার রাতে পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তা আলতাব হোসেনকে নির্দয়ভাবে পেটায় ১৫-২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় অন্তত আট আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের ভাষ্যে জানা যাচ্ছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ‘মাদকাসক্ত’। সাভারের বিভিন্ন স্থান থেকে আমিনবাজারের ওই স্থানটিতে তারা জড়ো হয়ে নিয়মিত মাদকের আড্ডা বসাত। তারা এতটাই বেপরোয়া যে পুলিশ পরিচয় দিয়ে প্রবীণকে রক্ষা করতে গেলে উল্টো তারা আলতাব হোসেনের ওপর হামলা করে। এ ঘটনা দুটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। প্রথমত, অপরাধীদের হাতে পুলিশ সদস্যই যখন নিরাপদ নন, তখন সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়। দ্বিতীয়ত, আমিনবাজারের মতো ঢাকার একেবারে সন্নিকটে একটি স্পটে মাদকসেবীরা নিয়মিত মাদকের আড্ডা বসালেও তার খোঁজ পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন জানবে না?

 অপরাধ বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দেশে সাম্প্রতিক কালে খুন, ধর্ষণ ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে মাদকের অবাধ বিস্তারের বিষয়টি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। সম্প্রতি রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যার সঙ্গে জড়িত আসামিরাও মাদকাসক্ত বলে পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্যে জানা যাচ্ছে। এর আগে লক্ষ্মীপুরে এক পরিবারের চারজনকে হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধীও মাদকাসক্ত ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।

মাদকের গুরুতর মামলা বিশ্লেষণ করে প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, গাজীপুর, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, সিলেট—এই আট মহানগর মাদকের বড় বাজার হয়ে উঠেছে। মাদকের গুরুতর মামলার ২৯ শতাংশই আট শহরের। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতেও মাদকের মামলা বেশি। মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক বড় শহরগুলো থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।  

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যে জানা যাচ্ছে, গত পাঁচ মাসে কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে আসা ছয়টি বড় ঘটনায় ২৭ লাখ ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। এ তথ্যই বলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট যে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, আইসের মতো ভয়ংকর মাদক কীভাবে বানের স্রোতের মতো দেশে প্রবেশ করছে এবং গ্রাম-মফস্‌সলেও কিশোর-তরুণদের কাছে সহজলভ্য হয়ে গেছে।

 মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালনাধীন এক গবেষণায় জানা যাচ্ছে, দেশে বর্তমানে ৮৪ লাখের বেশি মানুষ মাদকাসক্ত। মাদকের পেছনে সেবনকারীরা বছরে আনুমানিক ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে তাদের একটি বড় অংশই নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

দেশে মাদকের এই বিস্তার পুরোনো সংকট হলেও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশি কার্যক্রম ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারিতে যে শিথিলতা বিরাজ করছে, তার সুযোগে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে পাচারকারীরা। দুর্বল অভিযোগপত্র এবং যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণের দুর্বলতায় মাদকের মামলায় বিচার ও সাজার হারও কম। বিচারহীনতার এই বাস্তবতাও মাদক নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠার বড় কারণ।

মাদকের অবাধ বিস্তার নাগরিক নিরাপত্তার বড় হুমকির কারণ হয়ে উঠলেও এর নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ দৃশ্যমান নেই। মিয়ানমার ও ভারতের যেসব সীমান্ত দিয়ে দেশে মাদক প্রবেশ করে, সেই উৎসমুখ বন্ধ করতে না পারলে যতই পদক্ষেপ নেওয়া হোক না কেন, সেটা ফলপ্রসূ হবে না। আমরা মনে করি, মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সীমান্ত থেকে মহানগর পর্যন্ত মাদকের যে সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেটা ভেঙে দিতে হবে। না হলে আজ সাভার, কাল রংপুর, পরশু লক্ষ্মীপুর—একের পর এক ভয়ানক অপরাধ ঘটতেই থাকবে।