গাইবান্ধার কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘নীতিমান শিশু, সুখী বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা শুধু প্রশংসনীয় নয়; বরং বর্তমান জাতীয় পটভূমিতে অত্যন্ত সময়োপযোগী। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ধৈত্রী সরকারের মতো হাজারো শিশুর ‘ভালো কাজের খাতা’ অনুসরণ করা এবং দৈনন্দিন জীবনে সততার চর্চা করা আমাদের আশান্বিত করে। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে শৈশবেই যদি সঠিক মূল্যবোধের বীজ বপন করা যায়, তবে একটি মানবিক ও সৎ প্রজন্ম গড়ে তোলা অসম্ভব কিছু নয়।
আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় জিপিএ-৫ কিংবা পাঠ্যবইয়ের ভালো ফলের ওপর যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, শিক্ষার্থীর চারিত্রিক উৎকর্ষ বা নৈতিকতার ওপর ততটা জোর দেওয়া হয় না। ফলে মেধাবী অনেক শিক্ষার্থী বের হলেও তাদের মধ্যে মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব লক্ষ করা যায়। গাইবান্ধার এই মডেল সেই অভাব পূরণের একটি কার্যকর পথ হতে পারে। শিক্ষার্থীরা এখন রাস্তা থেকে কলার খোসা সরাচ্ছে, মিথ্যা বলা পরিহার করছে কিংবা অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকছে—এগুলো ছোট কাজ মনে হলেও একজন নাগরিকের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার ভিত্তি হলো এই ইতিবাচক অভ্যাসগুলো।
এ প্রকল্পের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক এই তিন পক্ষের সমন্বয়। মাসের শেষে অভিভাবক যখন শিশুর ভালো কাজের খাতা মূল্যায়ন করছেন এবং শিক্ষকেরা তাতে নম্বর দিচ্ছেন, তখন শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি ইতিবাচক জবাবদিহি তৈরি হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ পাইলট প্রকল্প হিসেবে সফল হয়েছে, যা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্যেও স্পষ্ট। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের অনুপস্থিতিতেও শিক্ষার্থীদের সুশৃঙ্খল থাকা কিংবা অন্যের জিনিসে হাত না দেওয়ার মতো পরিবর্তনগুলোই এই প্রকল্পের প্রকৃত অর্জন।
গাইবান্ধার এই ‘সততা ও নৈতিকতা চর্চা’র মডেলটি সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। জাতীয় শিক্ষাক্রমের অংশ হিসেবে যদি নৈতিক কাজকে নিয়মিত মূল্যায়নের আওতায় আনা যায়, তবে পাঠ্যবইয়ের তাত্ত্বিক শিক্ষার বাইরে শিশুরা ব্যবহারিক জীবনেও আদর্শ মানুষ হওয়ার প্রেরণা পাবে। শৈশবে গড়ে ওঠা এই নৈতিকতার ফুলগুলোই ভবিষ্যতে সমাজ থেকে দুর্নীতি ও অনৈতিকতার অন্ধকার দূর করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
একটি জাতি গঠনে শুধু শিক্ষিত প্রজন্মই জরুরি নয়, নৈতিকভাবেও তাকে বলীয়ান হতে হবে। আর এর চর্চার উৎকৃষ্ট সময় হচ্ছে প্রাথমিকের শিক্ষাকাল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা এ ধরনের কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করতে পারেন।