সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ফেনীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

গ্রামীণ কাঠামো ভেঙে পড়ার দুঃসহ চিত্র

একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির দৃশ্যমান রূপ যদি তার নদী, উর্বর কৃষিজমি এবং জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে অর্জিত হয়, তবে তাকে কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়ন বলা যায় না। সম্প্রতি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে ফেনীর ছাগলনাইয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এক পর্যবেক্ষণমূলক ভ্রমণের যে চিত্র প্রথম আলোতে উঠে এসেছে, তা দেশের মফস্‌সল ও গ্রামীণ পরিবেশের এক চরম উদ্বেগজনক এবং ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতাকে উন্মুক্ত করে। 

ফেনী ও ছাগলনাইয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ জনপদের প্রবেশ ও বহির্গমন মুখে গড়ে ওঠা উন্মুক্ত ময়লার বিশাল ভাগাড় সত্যিকার অর্থেই দুশ্চিন্তা তৈরি করে। একটি পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করে মহাসড়কের পাশে এবং লোকালয়ের মুখে যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে রাখা কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্যই মারাত্মক হুমকি নয়, বরং তা স্থানীয় প্রশাসনের চরম ব্যর্থতারও প্রমাণ। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের তোয়াক্কা না করে আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ফসলি জমির ওপরের উর্বর মাটি (টপ সয়েল) কেটে ইটভাটায় যেভাবে ইট তৈরি হচ্ছে, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত। শীতলক্ষ্যার শিল্পবর্জ্যে কালচে হয়ে যাওয়া পানি কিংবা গোমতী নদী থেকে অবাধে বালু উত্তোলনের যে উৎসব চলছে, তা আমাদের নদীকেন্দ্রিক বাস্তুসংস্থানকে চূড়ান্ত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্থানীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আসলে কী দায়িত্ব পালন করছেন, সেই প্রশ্ন আজ অত্যন্ত জোরালো হয়ে উঠেছে।

কেবল বর্জ্য বা নদীদূষণই নয়, আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও উন্নয়নের একধরনের অন্ধ আঘাত আসছে। ফেনীর ঐতিহাসিক ২৩ একরের ‘কৈয়ারা দিঘি’, যা একসময় প্রাকৃতিক সম্পদ ও অতিথি পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল, তা আজ চরম অব্যবস্থাপনা ও গুচ্ছগ্রামের অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে নিজস্ব রূপ হারিয়ে মৃতপ্রায়। গ্রামীণ সড়কগুলোর দুই পাশে একসময় যেখানে আম, জাম বা কালোজামের মতো দেশীয় ফলের গাছ শোভা পেত, সেখানে আজ রেইনট্রি, মেহগনি বা আকাশমণির মতো আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতির গাছের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়েছে। এর ফলে আমাদের চিরচেনা বুনো উদ্ভিদ ও পাখিগুলো যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্যও বিঘ্নিত হচ্ছে।

আমরা মনে করি, অবিলম্বে ফেনী ও ছাগলনাইয়ার প্রবেশপথ থেকে উন্মুক্ত বর্জ্যের ভাগাড় অপসারণ করে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত ল্যান্ডফিল্ড বা ডাম্পিং স্টেশন তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিজমি ধ্বংসকারী অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করতে হবে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের উচিত হবে রাস্তা সম্প্রসারণের পর আবার বৃক্ষরোপণের সময় বিদেশি গাছের মোহ ত্যাগ করে উদ্ভিদবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী দেশীয় ও বিপন্ন প্রজাতির গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া।