আলু চাষে লোকসান

চাষিদের সুরক্ষায় নীতিসহায়তা প্রয়োজন 

আলু চাষ বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু রাজশাহীর তানোরসহ আলুপ্রধান অঞ্চলের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে—এই খাতে সবচেয়ে অনিরাপদ অবস্থানে আছেন খোদ চাষিরাই। মৌসুমে উৎপাদন খরচ না ওঠায় লোকসান ঠেকাতে চাষিরা যে হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন, সেটিও শেষ পর্যন্ত তাঁদের জন্য আরেক দফা আর্থিক ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার হিমাগার পর্যায়ে আলুর দাম কেজিপ্রতি ২২ টাকা ঘোষণা করলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবায়নের এই ফাঁকই চাষিদের সর্বনাশের মূল কারণ।

তানোরের একের পর এক চাষির অভিজ্ঞতা একই চিত্র তুলে ধরে; হিমাগারে রাখা শত শত, হাজার হাজার বস্তা আলু বিক্রি করেও হিমাগার ভাড়া, সুদ ও আনুষঙ্গিক খরচ শোধ করা যাচ্ছে না। উল্টো ঘরের জমানো টাকা খরচ করতে হচ্ছে। কেউ ১৬ হাজার, কেউ ৩ লাখ, কেউবা ২৭ লাখ টাকা লোকসান গুনেছেন। এমনকি কেউ কেউ আলু ছেড়ে দিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরেছেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকারি দামের ঘোষণা কার্যত একটি প্রতীকী আশ্বাসে পরিণত হয়েছে। হিমাগারে ২২ টাকা কেজির ব্যানার টানানো হলেও বাজারে আলু বিক্রি হয়েছে ৮–১০ টাকায়। এই দ্বিচারিতা শুধু চাষিদের আস্থা ভাঙেনি, বরং বাজারে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। দাম নির্ধারণ যদি কার্যকর করার সক্ষমতা না থাকে, তবে সে ঘোষণা চাষিদের বিভ্রান্ত করা ছাড়া আর কিছু নয়।

এর ফল ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। রাজশাহীতে এক মৌসুমেই প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ কমে গেছে। তানোরের মতো উর্বর ও আলুপ্রধান এলাকায় চাষিরা বাধ্য হয়ে জমি কমাচ্ছেন। এটি ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকট, দামের অস্থিতিশীলতা এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। আজ যে আলু চাষ কমছে, কাল তার মূল্য দেবে ভোক্তাও।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ‘ক্রপ জোনিং’-এর কথা বলা হচ্ছে, যা নীতিগতভাবে একটি ভালো ধারণা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বড় লোকসানের পর পরীক্ষামূলক উদ্যোগে চাষিদের আস্থা ফিরবে কীভাবে? চাষিরা যে সমস্যায় পড়েছেন, তা শুধু ‘অতিরিক্ত’ উৎপাদনের ফল নয়; এটি বাজার ব্যবস্থাপনা, মূল্য নির্ধারণ ও সংরক্ষণব্যবস্থার সমন্বয়হীনতার ফল।

হিমাগার মালিকদের ভূমিকাও প্রশ্নের বাইরে নয়। এজেন্টনির্ভরতা, স্বচ্ছ হিসাবের অভাব এবং একতরফা শর্ত চাষিদের আরও দুর্বল করে তুলছে। অথচ এই পুরো ব্যবস্থায় সবচেয়ে কম সুরক্ষা পাচ্ছেন চাষিরাই। এই সংকট থেকে বের হতে হলে কেবল ঘোষণা নয়, কার্যকর নীতিসহায়তা প্রয়োজন।