স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গবিদ্রূপের দোহাই দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের ব্যক্তিগত আক্রমণ ও যৌন হয়রানি বর্তমান সময়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে এসেছে, কিছু নির্দিষ্ট ফেসবুক পেজ সুপরিকল্পিতভাবে এবং নিয়মিত বিরতিতে প্রতিষ্ঠিত ও সফল নারীদের নিশানা বানাচ্ছে। এটি স্রেফ কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়; বরং একধরনের সংগঠিত ডিজিটাল সহিংসতা। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি খুবই উদ্বেগজনক।
ডিসমিসল্যাবের তথ্যানুযায়ী, ফেসবুকের অন্তত পাঁচটি পেজ বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়ানোর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। অবাক হওয়ার বিষয় হলো, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে তারা মূলধারার সংবাদমাধ্যমের নাম ও লোগো পর্যন্ত নকল করছে। গত বছরের শেষ দিক থেকে শুরু করে চলতি বছরের প্রথম ভাগ পর্যন্ত কয়েক হাজার পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে নারীদের নিয়ে করা বিপুলসংখ্যক পোস্টে চূড়ান্ত মাত্রার যৌন আক্রমণাত্মক ও মানহানিকর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও মডেলদের নিয়ে করা ফটোকার্ডগুলোর অধিকাংশই কুরুচিপূর্ণ। এই আক্রমণের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও।
এই ধরনের ঘৃণ্য প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হলো নারীদের জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং তাঁদের সামাজিক ও রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করা। কোনো বিষয়ে যখন একজন নারী বলিষ্ঠ ও যৌক্তিক মতামত পেশ করেন, তখন অনেক ক্ষেত্রে তাঁর কথা বা কাজের গঠনমূলক সমালোচনা না করে আক্রমণ করা হয় তাঁর পোশাক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে। এটি জনমানসে ওই নারীর বক্তব্যের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া এবং তাঁকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করার একটি অসুস্থ কৌশল।
প্রশ্ন হলো, এই ধরনের প্রকাশ্য অবমাননা ও লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নীরব কেন? স্রেফ লাইক কিংবা শেয়ার বাড়ানোর বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অন্যের চরিত্র হনন করার এই অসুস্থ সংস্কৃতি সমাজের মানসিকতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিশেষ করে ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়া অপরাধের শামিল।
স্যাটায়ারের মোড়কে চালানো এই যৌন হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাইবার জগতে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের, তেমনি সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোরও এর দায় রয়েছে। আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটগুলোকে এখনই এসব সুনির্দিষ্ট পেজের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অনলাইন জগৎকে এই নোংরা ও অসুস্থ মানসিকতা থেকে মুক্ত করা এখন অপরিহার্য। নারীরা সম্মানের সঙ্গে ও নির্ভয়ে জনপরিসরে বিচরণ করবে এবং নিজস্ব মত প্রকাশ করবে—এটাই কাম্য। এই পরিবেশ তৈরিতে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।