গত ১০ সেপ্টেম্বর শিক্ষক মূল্যায়নের একটি ওয়েবসাইট চালু করে বর্তমান ডাকসু।
গত ১০ সেপ্টেম্বর শিক্ষক মূল্যায়নের একটি ওয়েবসাইট চালু করে বর্তমান ডাকসু।

মতামত

শিক্ষক মূল্যায়ন কেন ডাকসুর এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ

মেয়াদ শেষের চার দিন আগে শিক্ষক মূল্যায়নের একটি ওয়েবসাইট চালু করে বর্তমান ডাকসু। সাইটের নাম ‘ডিইউ টিচার্স ইভাল্যুশন’। সেখানে শিক্ষার্থীরা নিজ বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করেছেন। শিক্ষকদের মূল্যায়নের ফলাফল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নানান বিতর্কও তৈরি হয়।

সাইটটিতে রিভিউ ফলাফল প্রকাশ ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। এই লেখা যখন লিখছি, তখন ৭ হাজার ৫০ জন শিক্ষার্থী সাইনআপ করেছেন, ২ হাজার ৪৫ জন শিক্ষকের জন্য ১১ হাজার ৩৪৭টি রিভিউ জমা পড়েছে। ডাকসুর এ উদ্যোগ নিয়ে সৃষ্ট ব্যাপক বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে নিবন্ধটি লিখছি। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ইউনিভার্সিটি/কলেজে পাঠদানের অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করব।

শিক্ষকদের মূল্যায়ন শিক্ষার্থীরা করবেন—এটা বেশ স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এর আয়োজন করবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, হয়তো তার রূপরেখা নির্ধারণ করবে একাডেমিক কাউন্সিল, বাস্তবায়ন করবে অনুষদ বা বিভাগ। এমনকি মূল্যায়নের ফলাফল কেবল শিক্ষকদের কাছে যাবে, শিক্ষার্থীরা তা জানতে পারবেন না।

শিক্ষকেরা মূল্যায়ন দেখে ধারণা পাবেন, তাঁর পাঠদানের প্রক্রিয়াটি শিক্ষার্থীরা কীভাবে গ্রহণ করছেন। তিনি ফলাফল দেখে তাঁর পাঠদানের প্রক্রিয়াটি পুনর্বিন্যাস করবেন। প্রয়োজনে বিভাগের চেয়ারম্যান বা অনুষদের ডিন তাঁর সঙ্গে ফলাফল নিয়ে বসবেন। বিশেষত যেসব শিক্ষকের মূল্যায়ন-ফলাফল সন্তোষজনক নয়, কীভাবে তাঁর উন্নয়ন ঘটানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে।

প্রথমেই বলতে হয়, ডাকসুর এ উদ্যোগ তাদের এখতিয়ারবহির্ভূত। মোটাদাগে ডাকসুর মূল কাজ হলো শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা—তাঁদের সুযোগ-সুবিধার তত্ত্বাবধান করা, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে কর্মসূচি দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ লালন করা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব তৈরিতে অবদান রাখা। তাদের সব কার্যক্রম শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক, শিক্ষকদের বিষয়ে ভূমিকা রাখা তাদের কাজ নয়। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মূল্যায়নব্যবস্থা চালু না থাকায় এবং ডাকসুর বিশেষ সামাজিক গুরুত্ব থাকায়, আলাপটি উপেক্ষাও করা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে বর্তমান শিক্ষার্থী-ইউনিয়নগুলো একটি ছাত্রসংগঠনের প্রাধান্যে রয়েছে এবং জুলাই আন্দোলন–পরবর্তী হট্টগোল পরিস্থিতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একের পর এক এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ করেই গেছেন (যেমন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন ডিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাসিবাদের দোসর চিহ্নিত করে শিক্ষকদের হেনস্তা করা, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃবৃন্দের নামীদামি সংবাদপত্র ও সাংস্কৃতিক ভবনকে ভস্মীভূত করতে উসকানি দেওয়া ইত্যাদি)। ফলে তাদের এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য নিয়েও তর্ক ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

তবে তাদের এ উদ্যোগের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের পদ্ধতির অনুপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা জোরদার হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষগুলোও একটা চাপের মুখে পড়েছে। আমি চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুকাল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘকাল পড়িয়েছি।

কখনোই শিক্ষার্থীদের দ্বারা শিক্ষক মূল্যায়নের মুখোমুখি হইনি। তবে ঢাকাতেই কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নানান সময়ে পড়িয়েছি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষক হিসেবে আমাকে শিক্ষার্থীরা মূল্যায়ন করেছেন। অন্তত একবার বিভাগীয় প্রধান মূল্যায়ন নিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করেছেন। তা থেকে আমার শিক্ষার্থীরা আমার পাঠদান কীভাবে গ্রহণ বা মূল্যায়ন করছেন, তার ধারণা পেয়েছি।

সাইনআপের সংখ্যার বিচারে এটি বড় একটি পোর্টালে পরিণত হয়, যা পরে ভায়াকম, চেড্ডার ও অল্টিস ইউএসএর মতো বড় বড় কোম্পানি একে কিনে নেয়। তবে ওসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ নিজ মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকায় এদের রেটিংকে কিছুটা বিবেচনায় নেওয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষকেরা অত বেশি পাত্তা দেন না। আর আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মূল্যায়নের ব্যবস্থা না থাকায় ডাকসুর উদ্যোগটাই বড় হয়ে কানে বাজছে।

যুক্তরাষ্ট্রে পড়াতে গিয়ে ব্যাপকভাবে বিষয়টির মুখোমুখি হলাম। বাংলাদেশে পড়ানোর অভিজ্ঞতা আর যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাসরুমে পড়ানোর মধ্যে প্যারাডাইমগত পার্থক্য রয়েছে। সংক্ষেপে বললে, দেশে পড়ানো প্রায় পুরোটাই শিক্ষকের লেকচারনির্ভর। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াতে গেলে দেখলাম, লেকচার কমিয়ে ক্লাস-অ্যাকটিভিটি বাড়ানোর একটা ব্যাপার আছে। লেকচারের পাশাপাশি গ্রুপ আলোচনা, রিডিং, ফ্রি-হ্যান্ড রাইটিং ইত্যাদির সমন্বয়ে ক্লাস পরিচালনা করতে হয়।

বড় ইউনিভার্সিটি নটর ডেম ছেড়ে যখন ছোট লিবারেল আর্টস কলেজ বার্ডে পড়াতে এলাম, এখানে দেখলাম বাড়তি একটা জিনিস—শিক্ষার্থীরা চ্যালেঞ্জড হতে পছন্দ করেন। অর্থাৎ শিক্ষক কিছুটা আলোচনা করে কঠিন একটা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ছুড়ে দেবেন, এবার শিক্ষার্থীরা গ্রুপ আলোচনায় তার উত্তর খুঁজে বের করবেন। বড় ক্লাসে, দেশে তো বটেই, বিদেশেও অনেক অনুৎসাহী-উদাসীন শিক্ষার্থী থাকেন। কিন্তু বার্ড কলেজের ছোট আকারের ক্লাসে শিক্ষার্থীরা কেবল শিখতে আসেননি, তাঁরা কঠিন কঠিন প্রশ্ন শিক্ষকের কাছ থেকে শুনতে চান, উত্তরটা নয়। উত্তর তাঁরা নিজে বের করতে চান, গ্রুপ ডিসকাশনে।

এমন পড়ানোর ধরন যেখানে, প্রথম সেমিস্টারে আমার মূল্যায়নের ফল ভালো আসেনি। এবার আমার সুপাইরভাইজার অধ্যাপক আমাকে নিয়ে বসলেন, হাতে মূল্যায়নপত্র। সেখানে ওভারঅল রেটিংয়ের পাশাপাশি বিস্তারিত অনেক বিষয় নিয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে—শিক্ষক কি প্রস্তুত হয়ে ক্লাসে আসেন, শিক্ষক কি আইডিয়া-তত্ত্ব পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারেন, শিক্ষক কি অ্যাসাইনমেন্টের ফিডব্যাক ঠিকঠাক দেন, শিক্ষককে কি প্রয়োজনের সময় পাওয়া যায়, শিক্ষকের পাঠদান কি ক্লাসরুমের বাইরেও ভাবতে প্ররোচিত করে ইত্যাদি।

এ ছাড়া বাড়তি ঘরে রয়েছে কোর্স ও শিক্ষক সম্পর্কে একটু বিস্তারিত লেখার সুযোগ। এসব পর্যালোচনা করে, পরের সেমিস্টারে সুপারভাইজার আমার সঙ্গে সঙ্গে রইলেন। আমার স্লাইড দেখে দেন, পরিবর্তনের পরামর্শ দেন এবং জোর দেন, গ্রুপ ডিসকাশনের প্রশ্নটি আরও সৃজনশীল করার ওপরে, যাতে শিক্ষার্থীরা সত্যিকার অর্থে চ্যালেঞ্জ অনুভব করেন। একদিন তিনি আমার ক্লাসে এলেন, পুরো ক্লাস শুনলেন, উন্নতির পরামর্শ দিলেন। পরের সেমিস্টারেরই আমার মূল্যায়নে লক্ষণীয় উন্নতি ঘটল।

শিক্ষার্থীর মূল্যায়নের পদ্ধতি এভাবে শিক্ষকের পাঠদানে উন্নতি ঘটাতে পারে। এখানে মন ভার করার বা অসম্মানিত বোধ করার কিছু নেই। চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, ভালো মানের পাঠদানের পদ্ধতি আত্মস্থ করা ও তা বাস্তবায়ন করা। কেবল একটা গড় রেটিং দিলেই হবে না, রেটিংটা কোন কোন নিক্তিতে এল, তা–ও বের করা দরকার।

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এসব ছাড়াই প্রতিষ্ঠাকাল থেকে পাঠদান করে আসছেন। সেটা এ যুগেও চলমান, সেটা বেশ বিস্ময়ের। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আজকালকার অধ্যাপকেরা অপরিচিত, তা–ও বলা যাবে না। তাঁরা যখন বিদেশে পিএইচডি করেছেন, দেখেছেন। তারা যখন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়িয়েছেন, মূল্যায়িত হয়েছেন। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের মধ্যে নিজের পাঠদানের পদ্ধতি উন্নত করায় অনাগ্রহ রয়েছে; বছরের পর বছর একই বিষয়, পুরোনো নোট-বইনির্ভর থেকে পড়ানোর চর্চা রয়েছে।

অথচ যেকোনো জ্ঞানকাণ্ডেই, জ্ঞান হালনাগাদ হতে থাকে। নিজেকে পুরোনো জ্ঞানে সীমাবদ্ধ রাখার মাধ্যমে তাঁরা শিক্ষার্থীদেরও নতুন জ্ঞান থেকে বঞ্চিত রেখে দেন। আর ক্লাস ঠিকঠাক না নেওয়া, পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব করা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অকারণ দুর্ব্যবহার করা, ক্লাস ও বিভাগের চেয়ে ক্লাসের বাইরে (রাজনীতি ও কনসাল্ট্যান্সি) বেশি ব্যস্ত থাকা, পছন্দ অনুযায়ী কাউকে সুবিধা দেওয়া ও অন্য কাউকে বঞ্চিত করার মতো ঘটনাগুলো যদি কেউ ঘটিয়ে থাকেন, মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকলে সেসব শিক্ষক বিপদে পড়বেন।

এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেবেন যাঁরা, সেসব কর্তা শিক্ষকদের অনেকেই এসব অবিদ্যায়তনিক কাজে জড়িত থাকেন। তাই মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি বলবৎ থাকলেও ব্যাপারটা ঘটেনি শেষ পর্যন্ত। ডাকসুর এ উদ্যোগের ফলে তাঁরা চাপের মুখে পড়েছেন। এবার যদি কিছু হয়! তবে এরপরও বলতে হবে, ডাকসুর এ উদ্যোগ এখতিয়ারবহির্ভূত এবং তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে তারা কতটুকু আন্তরিক ও সৎ, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

তাদের উদ্যোগকে তুলনা করা যায় ‘রেট মাই প্রফেসর’ উদ্যোগের সঙ্গে। রেট মাই প্রফেসর হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটা স্বাধীন উদ্যোগ। ১৯৯৯ সালে জন সোয়াপচেনস্কি নামের স্যান হোসে স্টেট ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থী (পরে তিনি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হন) এই পোর্টাল চালু করেন। এখানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রফেসরদের রেট করেন, কমেন্ট লেখেন।

সাইনআপের সংখ্যার বিচারে এটি বড় একটি পোর্টালে পরিণত হয়, যা পরে ভায়াকম, চেড্ডার ও অল্টিস ইউএসএর মতো বড় বড় কোম্পানি একে কিনে নেয়। তবে ওসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ নিজ মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকায় এদের রেটিংকে কিছুটা বিবেচনায় নেওয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষকেরা অত বেশি পাত্তা দেন না। আর আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মূল্যায়নের ব্যবস্থা না থাকায় ডাকসুর উদ্যোগটাই বড় হয়ে কানে বাজছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত অবিলম্বে মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করে উদ্ভূত পরিস্থিতির সামাল দেওয়া।

ফাহমিদুল হক যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক

মতামত লেখকের নিজস্ব