অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক (৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৪০–০৫ জুলাই ২০২৬)
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক (৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৪০–০৫ জুলাই ২০২৬)

বিশেষ সাক্ষাৎকার: আবুল কাসেম ফজলুল হক

তরুণ নেতৃত্ব সামনে এলেই দেশের সম্ভাবনা তৈরি হবে

শিক্ষাবিদ ও সমাজবিশ্লেষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর রচনা স্বদেশভাবনা ও রাজনৈতিক চিন্তায় ঋদ্ধ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ মুক্তিসংগ্রামকালের যাত্রার ধ্বনিনৈতিক চেতনা: ধর্ম ও মতাদর্শএকুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলনউনিশ শতকের মধ্যশ্রেণি ও বাঙলা সাহিত্য।  ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁর ৮৩তম জন্মদিনে প্রথম আলোয় এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তাঁর স্বদেশ, সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি ভাবনার একটি পরিচয় পাওয়া যায়। আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সাক্ষাৎকারটি আবারও প্রকাশিত হলো।

সাক্ষাৎকারটি নেন সোহরাব হাসান ও মনোজ দে  

প্রশ্ন

৮২ বছর পেরিয়ে আজ ৮৩-তে পা রাখলেন। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। জন্মদিনে আপনার অনুভূতিটা জানতে চাই।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। বন্ধুস্বজনেরা অনুষ্ঠান করে জন্মদিন উদ্‌যাপন করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি কখনো এ ধরনের আয়োজনে সম্মতি দিই না। তবে ঘরোয়াভাবে একটা আয়োজন থাকছে। আমরা যেহেতু দেশ, জাতি, জনজীবন, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করি, সেহেতু সেই আয়োজনে এসব বিষয়েও কিছু কথা বলব। আমার সারা জীবনের লেখালেখির উদ্দেশ্য দেশ ও জনগণের কল্যাণ। জন্মদিনে আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি হচ্ছে, যাঁরা দেশ-জাতি–মানুষ  নিয়ে চিন্তা করেন, কাজ করেন, তাঁরা যেন আমার বইগুলো পড়েন এবং এসব লেখা যদি তাদের কিছুটা কাজে লাগে তাতে সার্থকতা অনুভব করব।

প্রশ্ন

আপনি শিক্ষাবিদ ও লেখক হিসেবে সব সময় মানুষকে জাগাতে চেয়েছেন। কতটা পেরেছেন। হতাশা বোধ করেন কী?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: মানুষের জীবন নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতিতে অনেকে হতাশ হতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে মানবজাতির ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি যে মানুষ অনেক সময়ই সংকটে পড়ে। আবার সেই সংকট অতিক্রম করে ভালো অবস্থানে যাওয়ার জন্য প্রথমে কিছু মানুষ চেষ্টা শুরু করে। পরে বহু মানুষ তাতে যুক্ত হয়। সংকটও কেটে যায়। কিন্তু জীবনধারার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এক সংকট কেটে গেলে আরেক সংকট সামনে আসে। সমস্যার সমাধান করে যাওয়াই মানুষের কাজ।

প্রশ্ন

বর্তমান বিশ্বে যে সংঘাতময় বাস্তবতা বিরাজ করছে, তা থেকে উত্তরণ ঘটতে পারে কীভাবে?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: জীবন–জীবিকার প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ অনেক বেশি পরিশ্রম করছে, আবার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনেক সুফল মানুষ পেয়েছে। এসব কারণে প্রতিটি রাষ্ট্রেই সম্পদ অনেক বেড়েছে। গোটা পৃথিবীতে মানুষের খাওয়া-পরার মতো সমস্যার সমাধান অনেকটাই  সম্ভব হয়েছে। যদি এখন গোটা বিশ্বে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা যেত তাহলে সব মানুষ সম্মানজনকভাবে বাঁচতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে মানবজাতি সেই দিকে এগোচ্ছে না।

 কয়েক দশক ধরে যে শীতল যুদ্ধ চলছিল, ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে তার অবসান হয়েছে। কিন্তু এরপরও যুদ্ধ-সংঘাত থেমে নেই। উপসাগরীয় যুদ্ধ, বসনিয়া–হার্জেগোভেনিয়া যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ, লিবিয়া যুদ্ধ এবং সব শেষে ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটেছে। এদিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, বৃহৎ শক্তিগুলো, যাদের আমরা উন্নত বিশ্ব বলে থাকি, তারা অর্থনৈতিক বা সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী হলেও মানবিক দিক থেকে একটুও অগ্রসর হয়নি। মন–মানসিকতা সেই প্রথম কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে রকম বৈরিতাপূর্ণ ছিল, সে রকমই রয়ে গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পেছনে পশ্চিমাদের বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উসকানি ছিল। আবার পুতিন যে পথ নিয়েছেন,  তা–ও ভুল বলে মনে করি।

প্রশ্ন

  এ মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রধান সংকট কী বলে মনে করেন?

 আবুল কাসেম ফজলুল হক:  রাজনৈতিক সংকটটাকেই প্রধান বলব। তবে এখানে সাংস্কৃতিক সংকটও আছে। অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনে মানুষ নানাভাবে কাজ করছে। যেকোনোভাবেই হোক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের দরকার ছিল। বাংলাদেশে প্রথম থেকেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংহত করা যায়নি। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচনও সুষ্ঠুভাবে করা যায়নি। বেশ কিছু আসনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের জোর করে হারানো হয়েছে। এ নির্বাচনের কয়েক মাস পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচন হয়েছিল।

সেই নির্বাচনের দায়িত্বে আমরা ছিলাম। হলগুলোর ফলাফল তৈরি হয়ে গিয়েছিল, ডাকসুর ফলাফলও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল—সে সময় ছাত্রলীগের কিছু ছেলে কলাভবনের যেখানে ভোটগণনা চলছিল, সেখানে এসে ব্যালট বাক্স নিয়ে যায়। যে কাগজে আমরা ফলাফল তৈরি করছিলাম, সেগুলোও নিয়ে যায়। এ ঘটনাকে শুধু ছাত্রলীগের সমস্যা দেখলে চলবে না। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরও দায় ছিল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি দায় তৎকালীন সরকারের। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতিকে কতটা প্রভাবিত করত?

 আমি মনে করি, সেই নির্বাচনটা সুষ্ঠু করার প্রয়োজন ছিল। পাকিস্তান আমলে ডাকসুর নেতারা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা সুসংহত করতে পারেনি। সবখানেই বিশৃঙ্খলা ছিল। এরপর সেনাশাসন জারি হলো। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

প্রশ্ন

 এখনকার তরুণদের মধ্যে কোনো আশা দেখেন কি?

 আবুল কাসেম ফজলুল হক: তরুণেরা যে প্রবীণদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছেন, তাঁদের মধ্য কোনো উন্নত রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক চরিত্র নেই। এ থেকে বেরিয়ে কিছু তরুণের এখন এগিয়ে আসা উচিত। গত শতকের ষাটের দশকে আমি ছাত্রাবস্থায় কালের যাত্রার ধ্বনিতে তরুণদের জাগরণের কথাই বলেছিলাম। সেটি প্রথমে পুস্তিকা আকারে বের হয়েছিল। সেটা ঢাকা ও কলকাতায় অভিনন্দিত হয়েছিল। সে সময় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তরুণদের মধ্যে একটা জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলাদেশে এখন তরুণেরা মোট জনসংখ্যার বড় অংশ। আমি মনে করি, তরুণ নেতৃত্ব সামনে এলেই দেশের সম্ভাবনা তৈরি হবে। গণতন্ত্র সংহত হবে। এ জন্য তরুণদের কাজ করতে হবে।

প্রশ্ন

কিন্তু তরুণদের নেতৃত্বে আসার সম্ভাবনা কতটা দেখেন?

 আবুল কাসেম ফজলুল হক: মানুষের গড় আয়ু অনেক বেড়েছে। যাঁরা সরকার গঠন করেন, তাঁরা মনে করেন, বেশি বয়সীরাই মন্ত্রী হবেন। অপেক্ষাকৃত কম বয়সীরা প্রতিমন্ত্রী হবেন। আর তরুণদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। নেতৃত্ব আঁকড়ে রাখার এ ধরনের চিন্তাটাই ভুল। যাঁরা প্রবীণ তাঁদের অভিজ্ঞতা তরুণদের জানতে হবে। কিন্তু প্রবীণদের নির্বাহী দায়িত্বে রেখে তরুণেরা অগ্রসর হলে ভালো কিছু করতে পারবে না। উনিশ শতকে ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী বিদ্রোহ করেছিল। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে তরুণ মুসলিম লেখকদের নেতৃত্বে বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলন হয়েছিল। ষাটের দশকেও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তরুণেরা নেতৃত্ব দিয়েছে। পরিবর্তনের জন্য এখনো সে রকম একটা প্রজন্ম গড়ে ওঠা জরুরি।

প্রশ্ন

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খান মৃত্যুর কিছুদিন আগে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পুরোনো নেতৃত্ব দিয়ে কিছু হবে না, তরুণদের নেতৃত্ব এলেই পরিবর্তন হতে পারে। আপনিও কি তা মনে করেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: আকবর আলির এই বক্তব্য আমি সঠিক বলে মনে করি। আমি ও আকবর আলি খান একই বছর ঢাকা কলেজে পড়েছি। আমি বিজ্ঞানে পড়তাম, তিনি পড়তেন মানবিকে। এ কারণে সে সময় তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় হয়নি। পরবর্তীকালে হয়েছে। আকবর আলি খান একজন স্বাধীনচেতা, আত্মনির্ভর ও বিবেকসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। বিবেকের বাইরে কোনো কাজ তিনি করতেন না।

প্রশ্ন

তাহলে তরুণদের এগোনোর পথটা কী বলে মনে করেন?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: দৃঢ়চিত্ত তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অথচ এখানে ঐক্যের একান্ত অভাব। কেউ কাউকে মানতে চায় না। সংগঠন গড়ে তোলার জন্য একটা ক্ষমতাকাঠামোর প্রয়োজন হয়। দেখা যায় যে সভাপতি প্রার্থীর জন্য একসঙ্গে অনেকেই থাকেন। সংগঠনের একজন সভাপতি হলে বাকিদের তাঁকে মেনে নিতে হয়। কিন্তু সেটা মেনে নেওয়ার জন্য যে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও অনুশীলন প্রয়োজন গত ৫০ বছরেও তা দেখা যায়নি।

আমিও মনে করি, পুরোনো নেতৃত্বের পরিচালনায় তরুণেরা নতুন কিছু করতে পারবে না। তাদের স্বাধীনভাবে গড়ে উঠতে হবে। তবে সে ক্ষেত্রে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা তারা নিতে পারে। প্রবীণদের লেখা বইপত্র তারা পড়তে হবে, তাঁদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও আলাপ–আলোচনা করবে। কিন্তু কাজ করবে নিজেদের বুদ্ধিববেচনা অনুযায়ী। ইয়ং বেঙ্গল বিদ্রোহের ডিরোজিওদের মতো বাংলাদেশেও একদল নিবেদিতপ্রাণ তরুণ দরকার।

প্রশ্ন

বর্তমান রাজনীতির সংকট তৈরির কারণ কী বলে মনে করেন?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদের মতো তরুণ নেতারা ছয় দফা দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা ছয় দফার বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনঘনিষ্ঠ সেই কর্মসূচি আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছিল। জনগণের মাঝে ব্যাপকভাবে ছয় দফা ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় ছাত্রদের ১১ দফা কর্মসূচিও জনগণ ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছিল। এর আগে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচিতেও মানুষের আশা–আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের জনঘনিষ্ঠ কর্মসূচি দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

 বাংলাদেশ আমলে সব আন্দোলন হয়েছে নেতিবাচক কর্মসূচি দিয়ে। ফলে রাজনৈতিক আন্দোলন জনচিত্তকে আন্দোলিত করতে পারেনি। আমি বলব, নব্বইয়ের আন্দোলনও সে অর্থে গণ–আন্দোলন হয়ে ওঠেনি; যেমন হয়েছিল উনসত্তরে। নব্বইয়ের আন্দোলন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীর মতো বড় শহরগুলোয় সীমিত ছিল। আন্দোলনকারীরা ‘এক দফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি’—স্লোগান দিয়ে মাঠে নেমেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে কীভাবে তাঁরা দেশ চালাবেন, সেই কর্মসূচি দেননি। এরপর খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার আমলেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এখন বিএনপি যে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে, তাতেও তো জনগণের সমস্যার সমাধান হয়, এমন কোনো কর্মসূচি নেই।

প্রশ্ন

আপনাদের ধন্যবাদ।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: আপনাকে ধন্যবাদ।