চিঠিপত্র

হাওরবেষ্টিত গ্রামটিতে কি খেলার কোনো মাঠ থাকবে না

শহরের ছেলেমেয়েরা খোলা পরিবেশ পায় না, পর্যাপ্ত মাঠ পায় না। এদিন আর দূরে নয় যে গ্রামের ছেলেমেয়রাও এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে, যদি সরকার এ ব্যাপারে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়।
শহরের ছেলেমেয়েরা খোলা পরিবেশ পায় না, পর্যাপ্ত মাঠ পায় না। এদিন আর দূরে নয় যে গ্রামের ছেলেমেয়রাও এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে, যদি সরকার এ ব্যাপারে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়।

শহর, বন্দর, গ্রাম, প্রত্যন্ত জনপদসহ সবখানেই জমির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে জমির অভাবে বংশপরম্পরায় একত্রে বসবাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এরই ধারাবাহিকতায় মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম থেকে গ্রামে, শহর থেকে শহরে। এর মধ্যেও অনেকে আছেন, যাঁরা তাঁদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের কথা চিন্তা করে একত্রে অনেক জমি কিনে রেখে দেন তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য, যা বাংলার সব গ্রামের চিরচেনা দৃশ্য। আরেকটি কথা মানতেই হবে, বর্তমানে উন্নয়নের ব্যাপ্তি শহর থেকে ক্রমে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে, যা গতিশীল।

হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক, আমি এমনি একটি গ্রামের কথাই বলছি। যেটির অবস্থান ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নে। গোবিন্দশ্রী নামের গ্রামটি ১২টি ছোট-মাঝারি হাওরে দ্বারা বেষ্টিত। এখানে ছয় মাস যোগাযোগ করতে হয় ইঞ্জিনচালিত নৌকার মাধ্যমে। যেখানে ভাষাশহীদদের কবর রয়েছে। উপজেলা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্ব দিকে এর অবস্থান। এর আয়তন প্রায় ১৫ বর্গকিলোমিটার। প্রায় ১০ হাজার লোকের বসবাস এ গ্রামে। সরকারের নানা উদ্যোগের পাশাপাশি এ গ্রামে ৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি উচ্চবিদ্যালয়, ১টি দাখিল মাদ্রাসা, ১টি হাফিজিয়া মাদ্রাসা, ২টি কিন্ডারগার্ডেন, ২টি হেফজখানাসহ মোট ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, একটি প্রতিষ্ঠান ব্যতীত বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাধুলা করার কোনো মাঠ নেই। এমনকি এ গ্রামে খেলাধুলা করার মতো কোনো সাধারণ জায়গাও পর্যন্ত নেই।

গাছতলা নামের একটি জায়গায় ফি বছর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক খেলাধুলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো, যা আমাদের সময়েও দেখেছি। ঐতিহ্যবাহী এ মাঠে নিয়মিত বিভিন্ন মেলারও আয়োজন করা হতো। প্রচলিত ছিল যে প্রতিবছর চৈত্র মাসের প্রথম মঙ্গলবার ঐতিহ্যবাহী মেলা (স্থানীয় ভাষায় বান্নি বলা হয়) বসত এ মাঠে। দূরদূরান্ত ও আশপাশের উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে অনেক লোক এ মেলা উপভোগ করার জন্য আসতেন। কিন্তু ওই গাছতলা নামের জায়গাটি ব্যক্তিমালিকানায় থাকায় তা এখন ব্যবহার করা হয় আবাদি জমি হিসেবে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আউটডোর খেলাধুলা বন্ধ।

সাধারণত গ্রামে কারও না কারও জমি কোথাও না কোথাও অনাবাদি থাকে, যাতে গ্রামের তরুণেরা খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করেন। এর মধ্যে একটি হলো বারঘড়িয়া পাড়ার সঙ্গে লাগোয়া পাঁচকোণী নামের হাওরে ব্যক্তিমালিকানাধীন কয়েকজনের জমি। এই জমিগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে খেলাধুলা করে আসছে এ গ্রামেরই কিশোর ও যুবকেরা। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক খেলাধুলারও আয়োজন করা হতো এ মাঠে। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন থাকায় এই মাঠও বন্ধ হতে যাচ্ছে এ বছর থেকে। পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া জমিতে বসতবাড়ি/চাষাবাদ করার প্রয়োজন হওয়ায় এই অনাবাদি জায়গাটুকুও মাঠ হিসেবে আর থাকছে না! দিন দিন জমির দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে জমির মালিকদের পক্ষেও অন্যত্র জায়গা নিয়ে বাড়ি করা সম্ভব নয়। ফলে ১০ হাজার অধিবাসী ও ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানবিশিষ্ট গ্রামটিতে একটি মাঠ ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো মাঠ অবশিষ্ট থাকবে না।

শহরের ছেলেমেয়েরা খোলা পরিবেশ পায় না, পর্যাপ্ত মাঠ পায় না। এদিন আর দূরে নয় যে গ্রামের ছেলেমেয়রাও এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে, যদি সরকার এ ব্যাপারে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়। এর জ্বলন্ত উদাহরণ আমাদের গ্রাম। সরকারের পক্ষেই সম্ভব বারঘড়িয়া পাড়ার সঙ্গে লাগোয়া পাঁচকোণী নামের হাওরের সঙ্গে মাঠের মালিকদের বাড়ি করার জন্য অন্যত্র সমপরিমাণ জায়গা দেওয়া অথবা সমপরিমাণ দাম দিয়ে ওই মাঠ দাখিল মাদ্রাসার (এমপিওভুক্ত) আওতায় দেওয়া, তাহলে প্রতিষ্ঠানটিও একটি মাঠ পাবে।

শুধু পাঠদানের মধ্যেই একটি বিদ্যালয়ের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে যেসব চর্চার প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে হয়। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ শিক্ষাদান করা সম্ভব হয় না। খেলার মাঠ ব্যতীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অসম্পূর্ণ। তাই তো আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১১ মে জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বলেন, শিশুদের মেধাবিকাশে যেখানে খাসজমি আছে, সেগুলো যেন খেলার মাঠ বানিয়ে দেওয়া হয়।

আমাদের গ্রামে দ্বিতীয় কোনো খেলার মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীসহ সব কিশোর ও যুবকের সময় কাটানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এত বড় একটি গ্রাম, এতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, একটিমাত্র খেলার মাঠ! তাই পর্যাপ্ত খেলার মাঠের অভাবে এই গ্রামের কিশোর-তরুণেরা অলস সময় কাটাচ্ছে। চারদিকে হাওর, মাঝখানে দেখতে বদ্বীপের মতো গ্রামটিতে পর্যাপ্ত মাঠের অভাবে, সুস্থ পরিবেশের অভাবে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাধুলার চর্চা নেই বললেই চলে।

অতএব সংশ্লিষ্ট মহলের সবার কাছে আবেদন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, যেমন জমির মালিককে মাঠের মূল্য দিয়ে ওই দুটি মাঠকে গোবিন্দশ্রী গ্রামের যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আওতায় দিয়ে ছাত্রছাত্রীসহ ওই গ্রামের ছেলেমেয়েদের পরিপূর্ণভাবে সুনাগরিক হওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।

হিল্লোল আমীন
উন্নয়নকর্মী
hillul.sust@gmail.com