কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি

চিঠিপত্র

সৌদি আরব যা পারে, আমরা কেন পারি না

পবিত্র রমজান মাস এলেই আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের কপালে উদ্বেগের ভাঁজ পড়ে। সিয়াম সাধনার এই পবিত্র মাসে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে বাজারের ফর্দ ও সংসারের হিসাব মেলানোর সংগ্রাম। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে—বিশেষ করে সৌদি আরব—চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সম্প্রতি সৌদি আরবের ব্যবসায়িক সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ ও বাংলাদেশের অস্থির বাজারদরের সঙ্গে তুলনা আমাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

সৌদি আরবের বাজার: সেবার মানসিকতা

সৌদি আরবে পবিত্র রমজান মানেই ‘অফার’ ও ‘ডিসকাউন্ট’-এর উৎসব। সেখানে বড় বড় হাইপারমার্কেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য থাকে মানুষকে সেবা করে কীভাবে স্রষ্টার সন্তুষ্টি ও মানুষের দোয়া অর্জন করা যায়। সেখানে ব্যবসার মূল প্রেরণা অতি মুনাফা নয়; বরং ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতাই প্রাধান্য পায়।

বাংলাদেশের বাজার: অস্থিরতার আরেক নাম রমজান

বাংলাদেশের বাস্তবতা এর ঠিক উল্টো। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি ছোলার দাম ১১০ টাকা, চিনি ১০০ টাকা, অ্যাঙ্কর ডাল ৬৫ টাকা এবং ছোট দানার মসুর ডাল ১৭০ টাকা। ৫ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতলের দাম ৯৫০ টাকা। চালের বাজারও অস্থির—মিনিকেট চালের কেজি ৮৬ টাকা এবং মাঝারি মানের পাইজাম চাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর সঙ্গে শাকসবজি ও মাংসের আকাশছোঁয়া দাম সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, এই চড়া দাম পবিত্র রমজান মাসে স্থিতিশীল থাকবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, রমজানের অতিরিক্ত চাহিদাকে পুঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম আরও বাড়িয়ে দেবেন। প্রতিবছরই দেখা যায়, রোজা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাল, ডাল, চিনি ও বেসনের দাম নতুন করে লাফিয়ে বাড়ে। বর্তমানে যে মুরগি ১৯০ টাকায় বা যে সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, পবিত্র রমজানের প্রথম সপ্তাহেই তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়। যেখানে অন্যান্য দেশে পবিত্র রমজানে পণ্যমূল্য কমে, সেখানে আমাদের দেশে দাম বাড়ার এই প্রবণতা রীতিমতো আতঙ্কজনক।

পার্থক্যটা কোথায়

এই বৈপরীত্যের মূল কারণ মানসিকতার পার্থক্য। সৌদি আরবের ব্যবসায়ীরা বিশ্বাস করেন, পবিত্র রমজানে কম লাভে পণ্য বিক্রি করলে ব্যবসায় বরকত আসে। অন্যদিকে আমাদের দেশের অনেক ব্যবসায়ীর কাছে ‘বরকত’ মানে যেন বছরের নির্দিষ্ট সময়ে অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করা। সৌদি আরবে কঠোর বাজার তদারকি ও শক্তিশালী আইন প্রয়োগের কারণে সিন্ডিকেট গড়ে তোলার সাহস কেউ পায় না। অথচ আমাদের দেশে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা ও নজরদারির ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ।

আমাদের যা শেখার আছে

আমরা নিজেদের মুসলিমপ্রধান দেশ বলে গর্ব করি এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে যথেষ্ট সচেতন বলেই দাবি করি। কিন্তু ব্যবসা–বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সেই সততা ও নৈতিকতা কতটা প্রতিফলিত হয়, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। সৌদি আরবের ব্যবসায়ীরা যদি ছাড় দিয়েও লাভবান হতে পারেন, তবে আমাদের ব্যবসায়ীরা কেন পারবেন না? কম লাভে বেশি পণ্য বিক্রির মাধ্যমেও যে টেকসই ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করা সম্ভব—এ সত্য আমাদের বুঝতে হবে।

উপসংহার

পবিত্র রমজান আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়, ভোগের নয়। রমজানে বাজারদর আরও বেড়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। সৌদি আরবের ব্যবসায়িক মডেল বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।

সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে যে মুনাফা অর্জিত হয়, তা হয়তো ব্যাংক–ব্যালান্স বাড়ায়, কিন্তু স্রষ্টার সন্তুষ্টি নিশ্চিত করে না। ব্যবসায়ীদের নৈতিক পরিবর্তন এবং সরকারের কঠোর নজরদারিই কেবল বাংলাদেশের বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।

মো. আফতাব আনোয়ার বিআরডিবির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা