সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার শুনানি ও যুক্তিতর্ক চলাকালে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি আত্মপক্ষ সমর্থন করে আদালতে বক্তব্য দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সেই বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য দুই পর্বে তুলে ধরা হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় পর্ব
...আমি নিজেকে আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে মনে করি না। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই যে একই ধরনের মামলায় অভিযুক্ত হয়েও আরেকজন নেত্রী যেসব সুবিধা ভোগ করেছেন, আমি কখনো আদালতের কাছে তেমন সুবিধা দাবি করিনি। আমি দেশের একজন সাধারণ সিনিয়র সিটিজেনের প্রাপ্য অধিকারটুকু পেলেই খুশি।
আইনসম্মতভাবে ন্যায়বিচার ছাড়া মাননীয় আদালতের কাছে আমার চাইবার আর কিছু নেই। আজ আমার প্রতি যে ধরনের আচরণ করা হচ্ছে, তা আমার অবস্থান ও ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না এবং এর মাধ্যমে আমার প্রতি কোনো বৈষম্য করা হচ্ছে কি না, সেটাও আদালতের বিবেচনার বিষয় বলে আমি মনে করি।
...এই উপমহাদেশে মহাত্মা গান্ধী, মাওলানা শওকত আলী, মোহাম্মদ আলী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাস ও জওহরলাল নেহরুর মতো নেতাদেরও কোনো না কোনো আদালতের রায়েই কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছে। নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং, বার্ট্রান্ড রাসেল এবং বেনিগনো আকিনোর মতো মানুষদেরও কোনো না কোনো বিচারেই সাজা দেওয়া হয়েছে।
তথাকথিত সেই সব রায়ের পেছনেও কোনো না কোনো যুক্তি, অজুহাত ও আইন দেখানো হয়েছিল। হজরত ইমাম আবু হানিফা ও সক্রেটিসের মতো মহামানবদেরও তো বিচারের নামেই সাজা দেওয়া হয়েছিল। সেই সব বিচারকে কি বিশ্ববাসী ন্যায়বিচার বলে মেনে নিয়েছে?
ইতিহাসের ধোপে সেসব রায় কি টিকেছে? যাদেরকে অপরাধী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হয়েছিল, বিশ্বমানবতা ও ইতিহাস তাদেরই দিয়েছে অপরিমেয় মহিমা। ইতিহাস রায় দিয়েছে, নিরপরাধকে অপরাধী সাব্যস্ত করে যাঁরা রায় দিয়েছিলেন, তাঁরাই প্রকৃত অপরাধী। তাঁদের জন্য পারলৌকিক সাজা তো নির্ধারিত আছেই। এই পৃথিবীতেও তাঁদের নাম ও স্মৃতি যুগ যুগ ধরে অগণিত মানুষের ঘৃণা ও ধিক্কার কুড়াচ্ছে।
এ জগৎ যত দিন থাকবে, মানুষ যত দিন থাকবে, ইতিহাস যত দিন পাঠ করা হবে এবং যত দিন মানুষের স্মৃতি থাকবে, তত দিনই তাঁদের প্রতি চলতে থাকবে এই ঘৃণা ও ধিক্কার।
মাননীয় আদালত, ইতিহাসের এই সব শিক্ষা থেকে কেউ কেউ শিক্ষা নেন। আবার কেউ কেউ কোনো শিক্ষা গ্রহণ করে না। যাঁরা শিক্ষা নেন, মানুষ ও ইতিহাস তাঁদের সম্মানিত করে। আর যাঁরা কোনো শিক্ষা নেন না, তাঁদের ঠাঁই হয় ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে, আর মানুষের ঘৃণা ও ধিক্কারে। সময়ের পরিক্রমায় আজকের সময়ও একসময় ইতিহাস হবে। আলোচ্য এ মামলাও নিশ্চয়ই ইতিহাসের এক মূল্যবান উপকরণ হবে।
কাজেই এই পটভূমিতে আপনি ইতিহাসের শিক্ষা থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে। এর জন্য আপনাকে নির্ভর করতে হবে সুবিবেচনা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, সাহস ও সততার ওপর। অনাগত দিন বলে দেবে, আইন ও বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়ে আপনি সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পেরেছিলেন কি না।
► ভিন্নমত দলন ও দমন নয়, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসা নয়; বরং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহ-অবস্থানকে উৎসাহিত না করলে গণতন্ত্র টেকানো যায় না। ► ইতিহাসের এই সব শিক্ষা থেকে কেউ কেউ শিক্ষা নেন। আবার কেউ কেউ কোনো শিক্ষা গ্রহণ করে না। যাঁরা শিক্ষা নেন, মানুষ ও ইতিহাস তাঁদের সম্মানিত করে। ► আমি আমার পদে আসীন থাকার সময় কারও কোনো অর্থের দ্বারা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হইনি কিংবা কাউকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করিনি।
মতবৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয়ই হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য মাননীয় আদালত, আপনিও নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে মতবৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয়ই হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য। ভিন্নমত দলন ও দমন নয়, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসা নয়; বরং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহ-অবস্থানকে উৎসাহিত না করলে গণতন্ত্র টেকানো যায় না। আমরা সে কথা জানি, বুঝি এবং মানি।
আপনি জানেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যে ভিন্নমত ও দাবি আদায়ের পন্থা এ দেশে বারবার কতটা সহিংস হয়ে উঠেছে। আমি বেশি পেছনে ফিরে যাব না। সাম্প্রতিক অতীত থেকেই আমি কিছু উদাহরণ দেব। আজ যারা ক্ষমতায় আছে, সেই আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং তাদের একসময়কার ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সহযোগী জামায়াতে ইসলামী মিলে দেশে কী ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, তা আপনি জানেন।
নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন জাতীয় সংসদের নির্বাচনের বিধানের দাবিতে তারা আন্দোলনের নামে দেশে কী সহিংস হানাহানি ও নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি করেছিল, তা সকলেই জানে। দিনের পর দিন হরতাল-অবরোধে তারা জনজীবনকে অচল করেছে।
আমাদের জাতীয় অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’ সমুদ্রবন্দরকে দীর্ঘদিন বন্ধ করে রেখেছে। রেলস্টেশন জ্বালিয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষকে বহনকারী যানবাহনে বোমা মেরেছে এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে। গানপাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে চলন্ত বাসের বহু নিরপরাধ যাত্রীকে তারা জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছে। বিভিন্নভাবে আরও বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারের মাথা তারা ইট দিয়ে থেঁতলে দিয়েছে।
অফিসগামী বয়স্ক মানুষকে রাস্তায় ধরে প্রকাশ্যে দিগম্বর করেছে। মেয়েদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত করেছে। সচিবালয়ের ভেতরে হাঙ্গামা করেছে এবং বিভিন্ন জায়গায় নোংরা ছড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা অবরোধ করে টানা অবস্থান নিয়ে জনচলাচল বন্ধ করে রেখেছে। সিভিল প্রশাসনে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা উসকে দিয়েছে।
সর্বোপরি গণতন্ত্র ধ্বংস করে সশস্ত্র বাহিনীকে ক্ষমতা দখলের জন্য প্রকাশ্যে উসকানি দিয়েছে। আমি বিস্তারিত বিবরণ দিতে চাই না। ২০০১ সালে জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে আমরা আবারও সরকারে আসি।
তারপর আবারও শুরু হলো রাজপথে আন্দোলনের নামে সহিংস হানাহানি, যা আমাদের পুরো মেয়াদে অব্যাহত ছিল। সেই সহিংসতা থেকে পুলিশ, বিচার বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতির এজলাস পর্যন্ত কোনো কিছুই রেহাই পায়নি।
সেই ধারাবাহিক সন্ত্রাসের পরিসমাপ্তি ঘটে প্রকাশ্য রাজপথে পৈশাচিক কায়দায় লগি-বইঠা দিয়ে পিটিয়ে অনেক মানুষকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে। এসব কর্মকাণ্ডের পরিণামও শুভ হয়নি। হানাহানির অজুহাতে জাতীয় নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে স্থগিত করে দিয়ে তখনকার সেনাপ্রধান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে নেন।
তাঁর অনুগত একটি গোষ্ঠীকে নিয়ে তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা জরুরি সরকার গঠন করে। তাদের সামনে রেখে সেনাপ্রধান সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন। নির্বাচন পিছিয়ে সেই অবৈধ শাসনকে দুই বছর পর্যন্ত প্রলম্বিত করা হয়।
আপনি জানেন, আমি এই অবৈধ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করিনি; বরং এখন যাঁরা জনগণের ভোট ছাড়াই অবৈধভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, তাঁরাই সেদিন বিপুল উৎসাহ ও উল্লাস নিয়ে সেদিনের অবৈধদের সমর্থন করেছিলেন। বলেছিলেন, ওটা তাঁদেরই আন্দোলনের ফসল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ওই অবৈধ শাসকদের আসল চেহারা ও উদ্দেশ্য সকলের সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়।
আমি এবং শেখ হাসিনা—এই দুজনকেই জোর করে ‘মাইনাস’ করার উদ্দেশ্যে তারা সব ধরনের তৎপরতা শুরু করে। আমাকে গৃহবন্দী করা হয়। বিদেশ সফররত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তিনি দেশে ফিরে এলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত প্রাঙ্গণেই তিনি চরম অশোভন আচরণের শিকার হন।
আমি কিন্তু তখন চুপ করে থাকতে পারতাম। কিন্তু অন্যায়কে আমি মেনে নিইনি। গৃহবন্দী অবস্থা থেকেই আমি শেখ হাসিনার প্রতি সেই অন্যায় আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। আমি আমার বিবৃতিতে তাঁর মুক্তির দাবি করেছিলাম।
এই প্রসঙ্গে সে সময়কার কিছু কথা বলতে হয়। আমার নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভাবিনি। মঈনউদ্দীন-ফখরুদ্দীনের জরুরি সরকার কোনো বৈধ সরকার ছিল না। সেই সরকার সংবিধান অনুযায়ী গঠিত হয়নি। জোর করে অস্ত্রের মুখে তারা ক্ষমতা নিয়েছিল।
প্রায় দুই বছর জরুরি অবস্থা জারি করে অবৈধভাবে ক্ষমতায় ছিল। আমি কখনো কোনোভাবে তাদের সমর্থন করতে পারিনি। তারা আমার সমর্থন চেয়েছিল। আমাকে সপরিবার নিরাপদে দেশত্যাগ করার জন্য তারা বলেছিল। আমি তাদের কথা মানিনি। আমার নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভাবিনি।
আমি তাঁদের স্পষ্ট ভাষায় বলেছি, বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। জীবনে-মরণে আমি বাংলাদেশেই থাকতে চাই। শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সেই অবৈধ সরকারকেই সমর্থন করেছিল। তাঁরা তাঁদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানেও সানন্দে যোগ দিয়েছিলেন।
তাঁদের পরামর্শে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছিলেন। যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কাছে বলে গিয়েছিলেন যে সেই অবৈধ সরকার তাঁদেরই আন্দোলনের ফসল। তিনি তাঁদের সকল কাজের বৈধতা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। এমনকি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও আমার বড় ছেলে তারেক রহমানের দিকে ইঙ্গিত করে তাকে গ্রেপ্তার করার জন্যও সেই অবৈধ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তারেক রহমান পঙ্গু হয়ে এখনো বিদেশে চিকিৎসাধীন মাননীয় আদালত, আপনি জানেন, ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দীনের অবৈধ সরকার মিথ্যা মামলায় আমাকে এবং আমার দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছিল। বন্দী অবস্থায় পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে তাদের হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল।
আমার বড় ছেলে তারেক রহমান সেই নির্যাতনে পঙ্গু হয়ে এখনো বিদেশে চিকিৎসাধীন। আমার ছোট ছেলেটি আর সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায়নি। বিদেশে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে অকালে আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছে। সন্তানের অকালমৃত্যুর সেই দুঃসহ ব্যথা বুকে চেপে আমি এখনো দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।
...আমি আমার পদে আসীন থাকার সময় কারও কোনো অর্থের দ্বারা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হইনি কিংবা কাউকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করিনি। আমি আমার পদে আসীন থেকে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি এবং কোনো আইনভঙ্গ ও অপরাধ করিনি। আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং এ মামলায় বেকসুর খালাস পাওয়ার যোগ্য।
আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতটির বাংলা তরজমার কথা উল্লেখ করে।
‘হে ইমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সংগত সাক্ষ্যদান করো, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী তোমাদের চাইতে বেশি। অতএব তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ কোরো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলো কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজকর্ম সম্পর্কেই অবগত।’
মাননীয় আদালত আপনাকে ধন্যবাদ। আল্লাহ হাফেজ।