অভিমত

কোন কারণে আপনাদের সমাবেশে যাব, বোঝান তো ভাই!

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন আগামী ১ সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠেয় ছাত্রলীগের সমাবেশ নিয়ে বলেছেন, ‘জাতির পিতা ও বঙ্গমাতার প্রতি ছাত্রসমাজের যে আবেগ, তা দেখা যাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে। শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশ স্বপ্ন এগিয়ে নিতে ওই দিন লাখো ছাত্র-তরুণ সমবেত হবেন। এটি হবে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ছাত্র সমাবেশ।

আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের উত্তরোত্তর উন্নতি এবং মঙ্গল হোক, এই শুভকামনা রইল। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল বা মতের অনুসারী নন, এমন একজন সাধারণ ছাত্র-তরুণ হিসেবে আমি কেন সেই সমাবেশে যোগ দেব, সে উত্তর আমার কাছে অস্পষ্ট। কেন অস্পষ্ট, তা ব্যাখ্যা করতে অরাজনৈতিক ও কোনো মতের অনুসারী নন, এমন তরুণদের অবস্থান থেকে ছাত্রলীগের সত্যিকারের আবেগ ও চেতনা এবং গত ১৫ বছরে ছাত্রসমাজের ন্যায্য পাওনা ও প্রাপ্তির আন্দোলনে ছাত্রলীগের অবদান হিসাব করা যাক।

১.
২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় আমাদের টিউশন ফির ওপর ভ্যাট আরোপ করা হলো। সহজ কথায় বললে, আমি সুশিক্ষিত হব, সুনাগরিক হব—এই জন্য সরকারকে টাকা দিতে হবে—এমন দাবি করা হলো। একে তো এমনিতেই বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কম, সেখানে যারা বাবার টাকার দণ্ডি দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত, তাদের ওপর করারোপ করা হলো। সেবার আমাদের প্রবল আন্দোলনের মুখে সরকার এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছিল। কিন্তু এই ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে ছাত্রলীগকে আমরা কি পাশে পেয়েছিলাম? পাইনি তো!

২.
২০১৮ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের কথা সবারই জানা। সেবার এই ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাস্তায় নামা চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ সমাজকে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হতে হয়েছিল। অথচ ছাত্ররাজনীতিভিত্তিক দল হিসেবে তাদের উচিত ছিল এই ন্যায্য দাবি আদায়কারীদের পাশে দাঁড়ানো।

সরকারের স্মার্ট বাংলাদেশ স্বপ্ন এগিয়ে নিতে আপনারা লাখো ছাত্র-তরুণ সমবেত করবেন। খুবই ভালো কথা। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ ছাত্র-তরুণদের স্বপ্নের কী হবে? যারা সহিংসতামুক্ত ক্যাম্পাস চায়, যারা নিরাপদ সড়ক চায়, যারা বৈষম্যমুক্ত সমাজ চায়; আপনারা কি অনবরত তাদের গলা চেপে ধরবেন? লেজুড়বৃত্তি আর ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি করবেন?

৩.
২০১৮ সালে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় ঢাকার রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর সারা বাংলাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনরত স্কুল-কলেজপড়ুয়া কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপরও ছাত্রলীগ হামলে পড়েছিল। ঠিক কোন যুক্তিতে ছাত্রলীগ এই কোমলমতিদের ওপর রেগে গিয়েছিল, তা আজও ‘আবিষ্কার’ করা যায়নি।

৪.
বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড, আবরার হত্যাকাণ্ড ছাড়াও দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের হেনস্তার যেসব অভিযোগ পাওয়া যায়—নির্যাতন করা, হল থেকে বের করে দেওয়া, রাজনৈতিক মিছিলে যোগদানে বাধ্য করার মতো যেসব ঘটনা ঘটে, এর কোনোটির সঙ্গে ছাত্রলীগের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সম্পর্ক নেই!

৫.
সর্বশেষ ঘটনায় কয়েক দিন আগে সরকার চাকরিপ্রত্যাশীদের চাকরির আবেদনের ওপর ভ্যাট আরোপ করে। সহজ কথায় বললে, বেকারদের দায়িত্ব না নিয়ে কীভাবে তাঁদের আরও আর্থিক সংকটে ফেলা যায়, রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং সাধারণ ‘গাণিতিক সূত্র’ দিয়ে অনুমান করলে বলা যায়, যারা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে রাস্তায় নামবে, তাদেরও ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগ বেধড়ক পেটাবে।

সরকারের স্মার্ট বাংলাদেশ স্বপ্ন এগিয়ে নিতে আপনারা লাখো ছাত্র-তরুণ সমবেত করবেন। খুবই ভালো কথা। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ ছাত্র-তরুণদের স্বপ্নের কী হবে? যারা সহিংসতামুক্ত ক্যাম্পাস চায়, যারা নিরাপদ সড়ক চায়, যারা বৈষম্যমুক্ত সমাজ চায়; আপনারা কি অনবরত তাদের গলা চেপে ধরবেন? লেজুড়বৃত্তি আর ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি করবেন?

তাহলে ঠিক কোন কারণে আমি আপনাদের সমাবেশে যাব, আমাকে বোঝান তো ভাই!

যোবায়ের মাহমুদ উন্নয়নকর্মী