বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে বহু আগে থেকেই শিক্ষকদের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ছিল। সেই ক্ষোভ নতুন করে দানা বাঁধল ১৪তম গ্রেডের সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর, হিসাবরক্ষক, হিসাবরক্ষক কাম ক্লার্ক, উচ্চমান সহকারী, প্রধান সহকারীদের ১০ম গ্রেডের ‘সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা’ হিসেবে পদায়নের মধ্য দিয়ে।
যেসব শিক্ষক ১০ম গ্রেডের ‘সহকারী শিক্ষক’ হিসেবে চাকরিতে যোগদানের পর দীর্ঘ ২৫ থেকে ৩০ বছরের কর্মকালে একটিও পদোন্নতি পান না, অর্থাৎ , ‘সহকারী শিক্ষক’ হিসেবেই চাকরিকাল শেষ করেন, তাঁরা এবার ১৬তম গ্রেডের ‘অফিস সহকারী’ পদে যোগদান করা কর্মচারীদের অধীন চাকরি করবেন!
এই চমকপ্রদ ঘটনাটিই ঘটেছে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে। বহুল আলোচিত এই সরকারি প্রজ্ঞাপনে ৮২ জন সাঁটলিপিকার-উচ্চমান সহকারীকে ‘সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা’ হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় পদায়ন করা হয়েছে।
চাকরিতে পদোন্নতি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এই সুযোগ সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যই সমান ও বৈষম্যমুক্ত থাকা আবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশের পটভূমিতে এটা যেন এক অলীক কল্পনা।
এ দেশে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ পান শুধু বিসিএস ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তারা। এর বিপরীতে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য পদোন্নতির সুযোগ খুবই কম। আর শিক্ষক ও নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এ সুযোগ নেই বললেই চলে। এমনকি এ দেশে আন্তক্যাডার বৈষম্যও অনেক প্রকট। এই যেমন প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের তুলনায় শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ কম।
কিন্তু এই বৈষম্য দূর করতে গিয়ে যদি বিদ্যালয়ের অফিস সহকারীকে একটা উপজেলার সব শিক্ষকের বস বানিয়ে দেওয়া হয়, কিংবা সরকারি কোনো গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের গাড়িচালককে ‘গবেষণা কর্মকর্তা’ হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়, তাহলে কি সেটাকে প্রকৃত অর্থে বৈষম্য দূরীকরণের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে? পারে না; বরং এটা শিক্ষা প্রশাসনে একটি হযবরল অবস্থা সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রশাসক নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বহু আগে থেকেই মাধ্যমিকের শিক্ষকদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়ে আসছে। কারণ, ২০১১ সালে এক সরকারি আদেশবলে প্রকল্প থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত উপবৃত্তি বিতরণকারী কর্মকর্তাদের কোনোরূপ বিধিমালার তোয়াক্কা না করেই একলাফে ‘উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা’ হিসেবে পদায়ন করা হয়েছিল।
বাস্তবিক অর্থে, পৃথিবীর কোনো দেশেই এমন ঘটনা ঘটে না। কারণ, একজন গাড়িচালক তো আদতেও কখনো ‘গবেষণা কর্মকর্তা’র ভূমিকা পালন করতে পারেন না, তা তিনি ওই গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে যত বছরই কাজ করে থাকুন না কেন। ঠিক একইভাবে, কোনো বিদ্যালয় কিংবা শিক্ষা অফিসের কোনো অফিস সহকারী বা সাঁটলিপিকার কখনোই কোনো শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তার ভূমিকা পালন করতে পারেন না। কারণ, তাঁর কাজের ধরন ও পেশাগত অভিজ্ঞতা কোনোভাবেই একজন শিক্ষা কর্মকর্তার প্রাতিষ্ঠানিক কাজের সঙ্গে মেলে না। দুটো সম্পূর্ণ দুই মেরুর বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষকে এগুলোও দেখতে হলো!
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিদ্যালয়ের একজন অফিস সহকারী কখনো কোনো পদোন্নতি পাবেন না। অন্য আর দশটা গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো তিনিও তাঁর চাকরিজীবনে প্রাপ্য পদোন্নতিগুলো পাওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু সেটা তো কখনো কোনো অসম রেখা ভেদ করে হতে পারে না। এ সমস্যা সমাধানে ‘অফিস সহকারী’, ‘সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর’ কিংবা ‘গাড়িচালক’ পদের জন্য বরং আলাদা পদসোপান তৈরি করে সে অনুযায়ী তাঁদের পদোন্নতি দেওয়া যেতে পারে।
এই লেখার শুরুতেই বলেছি যে বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রশাসক নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বহু আগে থেকেই মাধ্যমিকের শিক্ষকদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়ে আসছে। কারণ, ২০১১ সালে এক সরকারি আদেশবলে প্রকল্প থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত উপবৃত্তি বিতরণকারী কর্মকর্তাদের কোনোরূপ বিধিমালার তোয়াক্কা না করেই একলাফে ‘উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা’ হিসেবে পদায়ন করা হয়েছিল।
এটা ছিল দেশব্যাপী উন্মুক্ত ও কঠোর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের জন্য তাঁদের গালে সজোরে চপেটাঘাতের শামিল। কারণ, যাঁরা রাজস্ব খাতভুক্ত কর্মকর্তা নন, তাঁদের রাতারাতি রাজস্ব খাতভুক্ত শিক্ষক/কর্মকর্তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বানিয়ে দেওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালার পদানুক্রম লঙ্ঘন করার শামিল। এতে মাঠ প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তা ছাড়া অপেক্ষাকৃত নিচের সারি থেকে লোক নিয়ে এসে শিক্ষকদের বস বানিয়ে দিলে, শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের প্রেষণা হারিয়ে ফেলেন। শিক্ষকতা পেশায় তাঁরা হীনম্মন্যতা বোধ করতে থাকেন। এটা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে একটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এই যে যুগে যুগে এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্তের রাশ টেনে ধরা যায়নি। প্রকল্পের সেই উপবৃত্তি বণ্টনকারী কর্মকর্তারা থেকে এই অধঃপতনের শুরু। এরপর সেসিপ প্রকল্পের ‘একাডেমিক সুপারভাইজার’ হয়ে এখন ১৪তম গ্রেডের সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, উচ্চমান সহকারী কিংবা হিসাবরক্ষকেরা শিক্ষকদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন!
পরিস্থিতি দিন দিন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে যে হয়তো কোনো এক কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে জেগেই শুনতে হবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অফিস সহকারী থেকে পদোন্নতি পাওয়া কোনো এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা!
রেজাউল ইসলাম লেখক ও শিক্ষক। ই-মেইল: rezadu367@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব