প্রথম আলোর মতামত বিভাগে ১১ মে ছাপা হওয়া ড. বিরূপাক্ষ পালের কলাম
প্রথম আলোর মতামত বিভাগে ১১ মে ছাপা হওয়া ড. বিরূপাক্ষ পালের কলাম

প্রতিক্রিয়া

বিরূপাক্ষ পালের লেখাটির ব্যাখ্যা কী

প্রথম আলোর মতামত বিভাগে ১১ মে ছাপা হওয়া একটি কলামে ড. বিরূপাক্ষ পাল অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে ‘ভণ্ডামির ছোঁয়া’ (মব-যুগের জাদুস্পর্শের) অর্থনীতি বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি কোনো প্রমাণ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মুদ্রাস্ফীতি কমেনি, বেকারত্ব বেড়েছে, বিনিয়োগ কমেছে এবং দারিদ্র্য বেড়েছে।

একই সঙ্গে ড. পাল নিজের কথারই বিরোধিতা করে প্রশ্ন তুলেছেন, বিএনপি সরকার কি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে? তিনি বেশ কৌশলের সঙ্গে ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের সেই শাসনামলের অর্থনৈতিক অবস্থাকে এড়িয়ে যাওয়ার বা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যে শাসনামলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের লুট করা হয়েছিল, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলো ডাকাতি করা হয়েছিল এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্য করে দেওয়া হয়েছিল।

ড. পাল এ সত্য উপেক্ষা করেছেন যে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা অর্থনীতিকে আইএমএফের লাইফ সাপোর্ট প্রোগ্রামের অধীন আইসিইউতে রেখে দিয়েছিল।

অর্থনীতিবিদ ড. পালের এই মতামতধর্মী লেখার ব্যাখ্যা কী? এটা কি তাঁর বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষপাতের কারণে, নাকি ইতিহাসসহ অর্থনীতি বিষয়ে যথাযথ ধারণার অভাবে হয়েছে?

ড. ইউনূস অর্থনীতির অবস্থাকে গাজার ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে তুলনা করায় বিরূপাক্ষ পাল অসন্তুষ্ট। তাঁর যুক্তি হলো, এ ধরনের বর্ণনা বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো নয়। তিনি এটাও পছন্দ করেননি যে বিএনপি সরকার সেই তথ্য-উপাত্ত উল্লেখ করছে না, যা তাঁর দাবি অনুযায়ী ইউনূস সরকারের অর্থনীতির ‘বিশাল’ ক্ষতি উন্মোচন করার জন্য থাকা উচিত ছিল; অথচ তিনি নিজে তাঁর দাবির সমর্থনে কোনো তথ্য-উপাত্ত দেননি। কোনো প্রমাণ উল্লেখ না করেই তিনি দাবি করেন, ড. ইউনূসের অধীন জুলাই-পরবর্তী দেড় বছরে অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, তা ইতিহাসে নজিরবিহীন।

ড. পাল এরপর উচ্চতর প্রবৃদ্ধির হার এবং মাথাপিছু জিডিপির কথা উল্লেখ করে দুর্নীতিগ্রস্ত হাসিনা সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের মহিমাকীর্তন করেন। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে জিডিপির ভালো-মন্দ উভয় ধরনের ফাঁদ সম্পর্কে তাঁর জানা উচিত। জিডিপি (অর্থনীতির মোট উৎপাদন) বাড়লেই যে দেশ ভালো চলছে—এটা সব সময় সত্য নয়। কারণ, খারাপ কাজ থেকেও জিডিপি বাড়তে পারে।

আপনি অনেক বন্দিশিবির বা ‘আয়নাঘর’ তৈরি করলেও জিডিপি বাড়বে; আপনি ‘ব্যবহারকারী-প্রদেয়’ (ইউজ-ফি) বেসরকারি ব্যবস্থার পক্ষে জনস্বাস্থ্য বা শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করলেও জিডিপি বাড়বে; আপনি আরও ইয়াবা উৎপাদন করলেও জিডিপি বাড়বে।

জিডিপি আরও বাড়বে, যদি আপনি আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটান এবং বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিকীকরণ করেন, যার ফলে আরও বেশি তালা তৈরি হবে, ঘুষের ব্যবসা ব্যাপক আকার ধারণ করবে এবং বেসরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থার বিস্তার ঘটবে। যখন আপনি পরিবহন সংস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করবেন না, তখন আরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটবে। যখন আপনি পরিবেশের যত্ন নেবেন না, তখন নদী ও জলপথ দূষিত হবে, অবৈধভাবে বন উজাড় করা হবে বা পাহাড় সমতল করা হবে।

অতএব জিডিপিতে কী কী অন্তর্ভুক্ত, কীভাবে তা উৎপাদিত হয় এবং কার জন্য তা উৎপাদিত হয়—এ প্রশ্নগুলো করা অত্যন্ত জরুরি। যদি আরও বেশি ভুল পণ্য উৎপাদিত হয়, যা সামাজিকভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে জিডিপি বৃদ্ধি কেবল মানুষের দুর্দশাই বাড়ায়।

সঠিক পণ্য উৎপাদিত হলেও দুর্দশা বাড়তে পারে; যদি উৎপাদনপ্রক্রিয়াটি পরিবেশের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়। এমনকি যখন পরিবেশগতভাবে টেকসই উপায়ে আরও বেশি সঠিক পণ্য উৎপাদিত হয়, কিন্তু তা শুধু ধনী ও বিত্তবানদের জন্য, তখন তাতে সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হয় না।

সুতরাং এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে কেন এত মানুষ অসুখী ছিল এবং সাধারণ মানুষ হাসিনার লুটেরা শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। নিজের শাসনের উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও জনগণের অসন্তোষে ফ্যাসিস্ট হাসিনার হতাশা বোঝা যেতে পারে। তা ছাড়া তিনি একজন অর্থনীতিবিদও নন; কিংবা তিনি তাঁর পাণ্ডিত্য বা বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের জন্যও পরিচিত নন।

কিন্তু অর্থনীতিবিদ ড. পালের এই মতামতধর্মী লেখার ব্যাখ্যা কী? এটা কি তাঁর বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষপাতের কারণে, নাকি ইতিহাসসহ অর্থনীতি বিষয়ে যথাযথ ধারণার অভাবে হয়েছে?

  • আনিসুজ্জামান চৌধুরী, ইমেরিটাস অধ্যাপক, ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া। নিউইয়র্ক ও ব্যাংককে জাতিসংঘে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
    তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী

    মতামত লেখকের নিজস্ব