এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রা বাড়বে, এটি ধরে নেওয়া যেতে পারে।
এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রা বাড়বে, এটি ধরে নেওয়া যেতে পারে।

অভিমত–বিশ্লেষণ

জলের ঘড়ি পাল্টে দেবে ‘খোকাবাবু’ এল নিনো

সমুদ্রের তাপমাত্রার বৃদ্ধিকে পেরু আর ইকুয়েডরের আদিবাসীরা আদর করে নাম দিয়েছিল ‘এল নিনো’ বা ‘খোকাবাবু’। এ বছর এর আগমন ঘটেছে ১১ জুন। এল নিনো নিয়ে লিখেছেন নাভিদ সালেহ

টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস নদীর উর্বরতার ইতিহাস আমাদের জানা। জানা সাড়ে পাঁচ হাজার বছর পুরোনো, সভ্যতার পাদপীঠ, মেসোপটেমিয়ার ঝলমলে শহর ব্যাবিলন আর উড়ুকের গল্প। তবে যেটুকু হয়তো খানিকটা কম জানা, তা হলো প্রমত্তা টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিসের জলপ্রবাহ আর প্লাবনের ইতিহাস। মেসোপটেমিয়ার বিখ্যাত ‘ফারটাইল ক্রিসেন্টে’ বা চন্দ্রাকৃতি উর্বর ভূমির ভাগ্যে পানি জুটত অফুরান, তবে অসময়ে। 

ফলনের মৌসুম যখন অনেক দূরবর্তী, সেই বসন্তে, গলিত হিমবাহের জলের তোড়ে ভেসে যেত নদীর দুকূল। আর যখন ফসলের মৌসুম, তখন হাহাকার করত মাটি। জলের আগমন আর জলের জন্য অপেক্ষার এই পৌনঃপুনিকতাই জন্ম দিয়েছিল চাষাবাদের কঠোর নিয়মানুবর্তিতার। তৈরি করতে হয়েছিল দিনপঞ্জি। জল সংগ্রহ, মৌসুমভেদে জলের বিতরণ করতে হয়েছিল ঘড়ি ধরে। জলের সঙ্গে তাই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছিল এই প্রাচীনতম সভ্যতা। মেসোপটেমিয়ায় পানির অভাব ছিল বলা চলবে না, তবে এটি নিশ্চিত করে বলা চলে যে জলের ঘড়ি চলত ইচ্ছেমতো, অনিয়মে। বাংলাদেশের জন্য এবারের ‘এল নিনো’র গল্প ঠিক তেমনি সময়ের গরমিলের।

  • এল নিনোর প্রভাব সামনে রেখে যদি সুপরিকল্পিত খাল খনন করা যায়, তাহলে বৃষ্টিহীনতার চাপ থেকে রক্ষা পেতে পারে বাংলাদেশের কৃষি। 

  • আমন ধানের ফলনের ওপর চাপ বাড়তে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর ভেতর রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর আর বরেন্দ্র অঞ্চল অন্যতম। 

প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রস্রোত, উপরিস্থিত বায়ুপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর এই বায়ুপ্রবাহই পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর থেকে জলীয় বাষ্প সংগ্রহ করতে করতে পৌঁছায় আমাদের উর্বর উপকূলে। এই যাত্রার সময় এমনই নিয়মিত, নিরন্তর যে আমাদের চাষাবাদের পুরো দিনলিপিই তৈরি হয়েছে মৌসুমের এই পুনরাবৃত্তিকে ঘিরে। যেমন বছরের শুরুর দিকে চাষ হয় বোরোর আর মাঝের দিকে আমন ধানের। আমন রোপণের পর তার বৃদ্ধির সময় দরকার হয় বৃষ্টিপাতের। তেমনি পাটের বৃদ্ধির সময়ও দরকার নির্ভরযোগ্য বর্ষণ। একইভাবে আখ চাষের জন্যও জরুরি ঝরঝরে, অবিরাম বৃষ্টিধারা। মুশকিল ঘটে, যখন এই বায়ুপ্রবাহ বা ট্রেড উইন্ডসে বাদ সাধে প্রকৃতি।

দক্ষিণ আমেরিকা–সংলগ্ন পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের জল আপাতশীতল আর পশ্চিমের জল উষ্ণ। সমুদ্রের উপরিস্থিত বায়ুর চাপ পশ্চিম থেকে পূর্বে বাড়তে থাকে। আর তাই বাতাসের প্রবাহ হয় উল্টো দিকে, অর্থাৎ পূর্ব থেকে পশ্চিমে, ভারত উপমহাদেশের দিকে। কিন্তু সাগরের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বায়ুচাপের এই স্বাভাবিক বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটে, যা বায়ুপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে।

নিয়মতান্ত্রিকভাবে বর্ষার আগমন তখন বাধাগ্রস্ত হয়। সমুদ্রের তাপমাত্রার এই বৃদ্ধিকে পেরু আর ইকুয়েডরের আদিবাসীরা আদর করে নাম দিয়েছিল ‘এল নিনো’ বা ‘খোকাবাবু’। এ বছর এই খোকাবাবুর আগমন ঘটেছে, ঘটা করে ১১ জুন। এবারের আগমন অনেকটাই সুতীব্র। ১৮৭৭ সালের পর, প্রায় ১৪০ বছরের বিরতিতে সম্ভবত সেই একই মাত্রা নিয়ে আবার ঘটছে খোকাবাবুর মহা প্রত্যাবর্তন, বা সুপার এল নিনো! প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কী করতে পারি এখন? কী করে নিজেদের তৈরি রাখবে বাংলাদেশের কৃষক–সমাজ, জনসাধারণ, সরকার?

নাভিদ সালেহ

এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রা বাড়বে, এটি ধরে নেওয়া যেতে পারে। এ বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাপপ্রবাহের জন্য তাই প্রস্তুত থাকতে হবে। দিনের তাপমাত্রা গড় থেকে ২ বা ৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে মূল সমস্যা দাঁড়াবে উষ্ণ দিনগুলোর একাধারে আগমনের কারণে। তাপপ্রবাহ যদি একনাগাড়ে ৫ থেকে ৭ দিন বা তার বেশি চলতে থাকে, তবে রাতের বেলায়ও বাতাসের তাপমাত্রা কমার অবকাশ পায় না। এ কারণে মানবদেহ বিশ্রাম বা স্বস্তির সুযোগ হারায়। এমনি সময়ে হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা বাড়ে। 

এ বছর উষ্ণতার সময় প্রচুর জলপান ও আপাতশীতল মরূদ্যানের সন্ধানে থাকতে হবে। এ জন্য নিজ ঘরে সুলভে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। খোলা জানালায় ভারী কাপড় বা পাটের পর্দা ভিজিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে বাইরের বাতাস কিছুটা শীতল হয়ে ঘরে প্রবেশ করবে।

এল নিনোর সময় খরা হবেই। তবে তা সর্বত্র দেখা দেবে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। এ বছর আবহাওয়ার সবচেয়ে জরুরি যে লক্ষণটির দিকে খেয়াল রাখতে হবে, তা হলো বর্ষার বিচ্ছিন্ন ও অনিয়মিত আনাগোনা। আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই অনিয়ম দেখা দেবে বাংলাদেশে।

আমন ধানের ফলনের ওপর চাপ বাড়তে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর ভেতর রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর আর বরেন্দ্র অঞ্চল অন্যতম। 

এ সময় উষ্ণ দিনের পুনরাবৃত্তি দীর্ঘ হতে পারে, বৃষ্টিপাত হতে পারে অনিয়মিত, এলোমেলো বিরতিতে। এতে ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণ কমবে, বাড়বে সেচের চাহিদা। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার মৌসুম হতে পারে আগামী বোরো মৌসুম। নভেম্বর থেকে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত খরার আশঙ্কা বাড়বে। ফলে বোরো ধানের রোপণ ও এর ফলনের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রচুর। আগামী বছরের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত বর্ষা-পূর্ববর্তী উষ্ণায়নের দিকে লক্ষ রাখা দরকার। এতে আউশের রোপণ ব্যাহত হতে পারে। অতি উষ্ণতায় জনস্বাস্থ্যের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। মনে রাখতে হবে, খোকাবাবুর এই প্রত্যাবর্তন কেবল ক্ষণিকের নয়। আগমনের এ ঘনঘটায় আবহাওয়ার ওলটপালট চলবে ১২ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত।

কৃষিক্ষেত্রের এই সম্ভাব্য চাপ থেকে পরিত্রাণের কি কোনো উপায় নেই? রাষ্ট্রীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে নিশ্চয়ই। বৃষ্টিপাতের সময় কিছু পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সরকার খাল খননের কর্মসূচিতে হাত দিতে যাচ্ছে। এল নিনোর এই প্রভাব সামনে রেখে যদি সুপরিকল্পিত খাল খনন করা যায়, তাহলে বৃষ্টিহীনতার চাপ থেকে রক্ষা পেতে পারে বাংলাদেশের কৃষি। মনে রাখতে হবে, সুপার এল নিনো যখন শেষবার দেখেছিল পৃথিবী, তখন খোদ ভারত উপমহাদেশেই দেড় কোটি মৃত্যু ঘটেছিল। পৃথিবী দেখেছিল দুর্ভিক্ষের ভয়াল রূপ। ইতিহাস থেকে তাই শিক্ষা নেওয়া চাই, নেওয়া চাই প্রস্তুতি।

এবারের সুপার এল নিনোর প্রভাবকে নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

জানতে হবে সম্ভাব্য সমস্যার পরিচয়। প্রস্তুত হতে হবে নিজ পরিবারকে সুস্থ রাখতে। পরিকল্পনা গড়তে হবে নিজ দেশকে প্রতিরক্ষা দিতে। স্মরণে রাখতে হবে, এবারের এল নিনো বৃষ্টিহীনতার পূর্বাভাস নয়। বরং জলের ঘড়িকে থমকে দেওয়া, বর্ষার নিয়মকে অনিয়মের দিকে ঠেলে দেওয়ার এক নিশ্চিত বাসনা নিয়েই এবার ফিরছেন খোকাবাবু।

নাভিদ সালেহ যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনের অধ্যাপক।

*মতামত লেখকের নিজস্ব