
এবারও নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের আগে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। আগের দুটি কমিশনের মতো এবারও সংলাপের পর একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে কমিশন গঠন করা হবে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। সংলাপ ও সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠন করা দুটি কমিশনই ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয়েছে। এবারের কমিশন কেমন হবে, তা সময় বলে দেবে।
আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি নতুন কমিশনকে দায়িত্ব নিতে হবে।
সংবিধানে একটি আইনের মাধ্যমে ইসি গঠনের নির্দেশনা আছে। কিন্তু গত ৫০ বছরে কোনো সরকার এই আইন করেনি। আইন না হওয়ায় নির্বাচন কমিশনার হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড নেই। দেশের রাষ্ট্রপতি কমিশনারদের নিয়োগ দেন।
ইসি গঠনে আইন না থাকায় সরকার নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সার্চ কমিটি ও কমিশন গঠনের সুযোগ পায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। কারণ, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ ছাড়া অন্যসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
আইন না করলেও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১২ সালে ইসি গঠনে একটি নতুন পদ্ধতি চালু করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। তিনি সব কটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে সংলাপে ডেকেছিলেন। পরে একটি সার্চ কমিটি গঠন করে তাদের প্রস্তাবিত নাম থেকে ইসি গঠন করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। তবে প্রথমবারের মতো নতুন এই পদ্ধতিতে গঠিত কাজী রকিব উদ্দীন কমিশন কোনো চমক দেখাতে পারেনি। বরং ২০১৪ সালে একটি ‘একতরফা’ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করে কমিশন ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। ওই জাতীয় নির্বাচনের আগে–পরে বিভিন্ন স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেও ইসির ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
জিল্লুর রহমানের পদ অনুসরণ করে ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গঠন করেন বর্তমান কে এম নূরুল হুদা কমিশন। কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই বছর কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন করে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু এরপর প্রায় সব স্থানীয় নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয়। বিভিন্ন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের নেতা–কর্মীদের হুমকি–ধমকি, ভোটকেন্দ্র দখল, জাল ভোট, ব্যালট ছিনতাই—এমন নানা অনিয়ম ঘটলেও ইসি ছিল অনেকটা নির্বিকার। এই কমিশনের বিরুদ্ধে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে গুরুতর অসদাচরণ, অনিয়মসহ ৯টি অভিযোগ এনে তা তদন্তের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়ে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দেন ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক। চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি তাঁরা এ বিষয়ে আরেকটি চিঠি দেন রাষ্ট্রপতিকে। তবে এ নিয়ে কোনো পদক্ষেপের কথা জানা যায়নি।
আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর দেশের ৫৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক এক বিবৃতিতে সংবিধানের আলোকে আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে নতুন নির্বাচন কমিশনের দাবি জানান। তাঁরা বলেন, বর্তমান ও এর আগের নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে নির্বাচনী ব্যবস্থায় মানুষের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। মানুষের আস্থা ফেরাতে নির্বাচন কমিশন এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যেটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।
ইতিমধ্যে আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, এবারও আইন হচ্ছে না। সার্চ কমিটির মাধ্যমে আরেকটি কমিশন গঠিত হতে যাচ্ছে।
সার্চ কমিটির কার্যপরিধি কেমন হবে, কারা এই কমিটিতে থাকবেন তা সুনির্দিষ্ট নয়। অবশ্য ২০১২ সালে ইসি গঠনের আগে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান করে ৪ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সদস্য হিসেবে ছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, তৎকালীন মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান।
২০১৭ সালে বর্তমান কমিশন গঠনের আগেও ৬ সদস্যের সার্চ কমিটি করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। ওই কমিটিরও প্রধান ছিলেন সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। কমিটির সদস্য ছিলেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, তৎকালীন সিএজি মাসুদ আহমেদ, পিএসসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য শিরীণ আখতার। গতবার সার্চ কমিটি গঠনের পর কমিটির সদস্যদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিএনপি।
বর্তমান কমিশন গঠনের আগে দেখা গেছে, রাষ্ট৶পতির সঙ্গে সংলাপে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো কমিশনার হিসেবে নিয়োগের জন্য পাঁচটি করে নাম প্রস্তাব করেছিল। সেগুলো সার্চ কমিটিকে দেওয়া হয়। ওই নামগুলো বিবেচনায় নিয়ে সার্চ কমিটি মোট ১০ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করেছিল। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি পাঁচ সদস্যের বর্তমান কমিশন গঠন করেন। তবে কার কার নাম কমিটি সুপারিশ করেছিল, তা প্রকাশ করা হয়নি।
নব্বইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট আটটি নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে। এর মধ্যে বর্তমান কমিশনসহ অন্তত চারটি কমিশন নিয়েই রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। আর এই চারটি কমিশনের মধ্যে দুটি কমিশনই গঠন করা হয়েছিল সার্চ কমিটির মাধ্যমে।
রাষ্ট্রপতির নিয়োগ করা ইসিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত ও বিতর্কিত হয়েছিল বিএনপির আমলে নিয়োগ পাওয়া এম এ আজিজের নেতৃত্বাধীন কমিশন। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন করার উদ্যোগ নিয়েছিল এম এ আজিজ কমিশন। তাঁর আমলে এক কোটির বেশি ভুয়া ভোটার তৈরির ঘটনা ঘটেছিল। ব্যাপকভাবে বিতর্কিত ওই কমিশনের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল আওয়ামী লীগ। শেষ পর্যন্ত ওই নির্বাচন হয়নি। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে তফসিল বাতিল করেছিল। তারও আগে বিএনপির আমলে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিল এ কে এম সাদেক কমিশন।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ইসি গঠনে আইন করার জন্য একটি খসড়া তৈরি করেছিল এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন। তবে সেটি আলোর মুখ দেখেনি। ওই কমিশনের সদস্য এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এখনকার পদ্ধতিতে গঠিত দুটি কমিশনের অভিজ্ঞতা ভালো নয়, এটি দেশে ও বিদেশে সবাই জানেন। আইন না হওয়ায় এখন যে ‘অ্যাডহক’ পদ্ধতিতে কমিশনারদের নিয়োগ করা হচ্ছে, তা খুব একটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নয়। এখন যে পরিস্থিতি তা রাজনৈতিকভাবে খুবই ক্রিটিক্যাল। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কমিশন যদি গঠিত না হয়, তাহলে দেশের ভাবমূর্তির অনেক ক্ষতি হবে। তিনি আশা করেন, মানুষের কাছে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে এবার ইসি গঠন করা হবে।