নরসিংদী জেলার রাজনীতি: জেলা বিএনপি

'খোকন খোকন ডাক পাড়ি, খোকন মোদের কার বাড়ি'

‘খোকন খোকন ডাক পাড়ি, খোকন মোদের কার বাড়ি। আয়রে খোকন ঘরে আয়, দুধ মাখা ভাত কাকে খায়।’
নরসিংদী বিএনপির বর্তমান অবস্থা এবং এর জেলা কমিটির সভাপতি খায়রুল কবির খোকনের কাছে নেতা-কর্মীদের চাওয়াকে রূপক অর্থে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের পরিচিত ছড়াটির সঙ্গে মিলিয়ে বর্ণনা করলেন দলটির কয়েকজন কর্মী।
এই কর্মীদের বক্তব্য, নরসিংদী জেলায় বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান বেশ শক্ত ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সাধারণ সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন জেলা কমিটির সভাপতি হওয়ায় দলের, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু এঁদের অভিযোগ, খোকন গুটি কয়েক নেতাকে নিয়ে চলেন, যাঁদের নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। তিনি সবাইকে নিয়ে চললে এবং নিজে দলের দিকে নজর দিলে সংগঠন হিসেবে বিএনপি আবার উঠে দাঁড়াতে পারবে।
এ থেকেই বোঝা যায়, জেলা বিএনপির রাজনীতি খোকনকে ঘিরেই আবর্তিত। ফলে সব ‘ভালো’-এর প্রশংসা যেমন তাঁর, তেমনি সব ‘ব্যর্থতার’ দায়ও তাঁর। দলে তাঁর সমালোচকেরা এ অবস্থায় কেন্দ্রের প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত আশা করছেন। আর খোকন দিচ্ছেন দল পুনর্গঠন করে এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার পরামর্শ।
বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে তা হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলনসহ রাজনৈতিক কোনো ইস্যুতেই নরসিংদীর বিএনপি কার্যকর কিছু করতে পারেনি। খায়রুল কবির খোকন ‘কয়েক মিনিটের আন্দোলন’ মানে গণমাধ্যমে মুখ দেখিয়ে গা ঢাকা দেন। এঁদের দাবি, দলের স্বার্থে নতুন কাউকে জেলার দায়িত্ব দেওয়া হোক।
এর মধ্যে নেতা-কর্মীদের একটা অংশের মুখে মনোহরদী-বেলাব আসনের সাবেক সাংসদ সরদার সাখাওয়াতের নাম উঠে এসেছে। তিনি দলে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত। তাঁর পক্ষে শিবপুর, মনোহরদী ও বেলাব উপজেলার বেশির ভাগ নেতা-কর্মীর সমর্থন রয়েছে। শিবপুরে বিএনপির সাবেক মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার অনুসারীরা খায়রুল কবিরের বিরোধী।
জানতে চাইলে সরদার সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘নরসিংদী বিএনপির বাস্তব অবস্থা কী, সরেজমিনে এলে তা যে কেউ বুঝতে পারবেন। এখানে খায়রুল কবির কি রাস্তায় আন্দোলন করেন, না ঘরে বসে ক্যামেরার সামনে আন্দোলন করেন? দলের চেয়ারপারসনের কাছে আমার অনুরোধ, তিনি এখানে এমন একজন কেন্দ্রীয় নেতা পাঠান, যিনি সব দেখে যাবেন এবং দলের স্বার্থে চেয়ারপারসনকে সব জানাবেন।’
জেলা বিএনপির সহসভাপতি ফেরদৌস খোকনও অভিন্ন সূরে বললেন, ‘বাস্তব সত্য হচ্ছে, এখানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন মানেই ফাঁকিবাজি। কোনো কর্মসূচিতেই আমরা রাজপথে সফল নই, শুধু ক্যামেরার সামনে সফল। যতক্ষণ ক্যামেরা থাকে, কর্মসূচি ততক্ষণই পালিত হয়।’
জানতে চাইলে খায়রুল কবির বলেন, ‘আমি কেন্দ্রীয় নেতা হওয়ার সুবাদে ঢাকায় দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে হচ্ছে। আবার নরসিংদী জেলার দায়িত্বে থাকার কারণে এখানেও কর্মসূচিতে অংশ নিতে হচ্ছে। এর মধ্যে নরসিংদীতে আমি থাকলে কর্মসূচি পালন করা হয়, আর না থাকলে হয় না। বেশির ভাগ নেতা-কর্মীর মধ্যে আমাকে দেখানো কর্মসূচি পালনের প্রবণতা আছে। এ কারণে আন্দোলনকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে নেওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি স্বীকার করেন, যেভাবে সাংগঠনিক কাজ করা দরকার, সেভাবে হচ্ছে না। তবে এর জন্য তিনি নেতা-কর্মীদের আন্তরিকতা, উৎসাহ-উদ্দীপনার অভাবকে দায়ী করেন।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে খায়রুল কবির বলেন, জেলা বিএনপিকে পুনর্গঠন ছাড়া এ সমস্যা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। সেখানে দলের জন্য যাঁদের দরদ আছে, তাঁদের প্রাধান্য দেওয়া হবে।
সম্প্রতি জেলা বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ে গিয়ে মূল ফটক তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। গত ১০ মার্চের পর থেকে গ্রেপ্তার আতঙ্কে কেউ দলীয় কার্যালয়ে আসছেন না বলে জানান কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক গোলাপ মিয়া।
মামলা-হামলার বিষয়ে নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, যেসব নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন, তাঁরা রয়েছেন মামলার বাইরে। খায়রুল কবিরের বিরুদ্ধে ঢাকা ও নরসিংদীতে মামলা রয়েছে ১৮টি, সাংগঠনিক সম্পাদক দ্বীন মোহাম্মদের বিরুদ্ধে একটি, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সমীর ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুটি, সম্পাদক নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে তিনটি, যুবদলের আহ্বায়ক মহসীন হোসাইনের বিরুদ্ধে সাতটি, ছাত্রদলের সম্পাদক আব্দুর রউফ ফকিরের বিরুদ্ধে তিনটি, শ্রমিক দলের সভাপতি রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে।
জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সদর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম বলেন, দলের প্রতি যাঁদের দায়বদ্ধতা আছে, তাঁরাই আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিলেন। যাঁরা মাঠে ছিলেন না, তাঁরা মামলা-নির্যাতনের বাইরে থাকতে পেরেছেন। হতে পারে তাঁরা সরকারদলীয় নেতাদের ও প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করে নিজেদের গা বাঁচিয়েছেন।
একাধিক নেতা বললেন, এ অবস্থায় হয় খোকনকে সত্যিকারের নেতা হিসেবে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে, না হয় কেন্দ্রকে কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে জেলার রাজনীতিতে ‘দুধ মাখা ভাত কাকে খায়’ অবস্থা হবে বিএনপির। মানে, বিপুল কর্মী-সমর্থক থাকলেও আন্দোলন-সংগ্রামে দল খুব একটা লাভবান হবে না।