‘জাকাতের চেয়ে চাঁদাবাজি ভালো’– বিএনপি নেতা নিলোফার চৌধুরী মনির এমন বক্তব্য–সংবলিত ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, তা নিয়ে আলোচনা–সমালোচনা দুটোই চলছে, প্রতিবাদও হচ্ছে।
যাচাই করে দেখা যায়, বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে নিলোফার চৌধুরীর বক্তব্য ধরে এই আলোচনার সূত্রপাত। সেই আলোচনায় তাঁকে জাকাত ও চাঁদাবাজি নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়।
আইনজীবী নিলোফার চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে বিএনপিতে যুক্ত। নবম সংসদে বিএনপি থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। এবার ত্রয়োদশ সংসদেও সংরক্ষিত আসনের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
স্টার নিউজের ইউটিউব চ্যানেলে ‘জুলাই সনদ: রাজনৈতিক কৌশল নাকি প্রতারণা?’ শিরোনামে ৫৪ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের একটি আলোচনা পর্ব ‘কড়া আলাপ’ প্রকাশিত হয় ২ মে।
আলোচনাটি সঞ্চালনা করেছিলেন উপস্থাপক ফারাবি হাফিজ। নিলোফার চৌধুরীর পাশাপাশি অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান এবং সাবেক সচিব আবু আলম শহিদ খান।
আলোচনার ভিডিওর ৪৯ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের সময় সহআলোচকের এক কথার পরিপ্রেক্ষিতে নিলোফার চৌধুরীর জাকাত নিয়ে মন্তব্যটি পাওয়া যায়।
লিংক: এখানে
আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘মব’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কথায় কথায় তারা ওইখান থেকে শুরু করেন “শাহবাগে আসো”, “রাজুতে আসো”, সেই দিয়ে তাঁরা যে শুরু করেছিলেন। এই মবে একটা ফ্যাসিস্টকে দূরীকরণ করা হয়েছে, আবার সেই মবটা বিএনপি কোনোভাবেই চায় না যে একটা মানুষের প্রাণও অন্যায়ভাবে চলে যাক।
তিনি পাশে থাকা জামায়াত নেতা আব্দুল মান্নানকে দেখিয়ে বলেন, ‘উনি বললেন, মবের সঙ্গে বিএনপি জড়িত। বিএনপি যদি মবের সঙ্গে এতই জড়িত থাকত, তাহলে বিএনপির মবগুলো বিএনপিরই বেশি হয়েছে। বিএনপির লোকরে তখনো মেরেছে।...কিন্তু মবের সঙ্গে জড়িত কারা? মব যেটা করেছে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মৃত্যুটা কিন্তু পুরাপুরি মব না। এটা অনেকটা নিজেদের তৈরি ক্যাওজ।’
তখনই পাশে থেকে জামায়াত নেতা আব্দুল মান্নান বলে ওঠেন, ‘চাঁদাবাজি, এগুলো কোনো সমস্যা না?’
জবাবে নিলোফার চৌধুরী বলেন, ‘চাঁদাবাজি তো বেটার আপনার জাকাতের চেয়ে, ফিতরার চেয়ে, লিল্লাহর চেয়ে...’
আব্দুল মান্নান তখন নিলোফার চৌধুরীকে বলেন, ‘আপা, এটা আরেকবার বলেন।’
তখন নিলোফার চৌধুরী বলেন, ‘আমি আবারও বলছি যে চাঁদাবাজির শাস্তি আছে, অপরাধের শাস্তি আছে। মার্ডারের শাস্তি কী? ৩০২ ধারা আর নরমাল শাস্তি কী? আপনার অ্যাটেম্পট টু মার্ডারের শাস্তি কী? দুইটা তো এক না...’
এই আলোচনা অনুষ্ঠানের একটি অংশ নিয়ে ‘জাকাতের চেয়ে চাঁদাবাজি অনেক ভালো: নিলোফার চৌধুরী মনি’ শিরোনাম দিয়ে ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ স্টার নিউজ তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে পোস্ট করে। ভিডিওটি এরই মধ্যে প্রায় ২ লাখ বার দেখা হয়েছে। এতে প্রতিক্রিয়া পড়েছে সাড়ে সাত হাজারের বেশি। ১ হাজার ৪০০ মন্তব্য হয়েছে। শেয়ার হয়েছে ১ হাজার ৫০০ বার।
লিংক: এখানে
নিলোফার চৌধুরীর এই বক্তব্য প্রকাশের পর ‘জাকাতকে হেয় করার’ প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দেয় জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে সেই বিবৃতি প্রকাশিত হয়।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দলের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেন, ২ মে সেটা তাঁদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। সেই বিবৃতিতে জাকাতের সঙ্গে চাঁদাবাজির তুলনাকে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার শামিল বলে মন্তব্য করে নিলোফার চৌধুরীকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এদিকে ‘জাকাতের চেয়ে চাঁদাবাজি অনেক ভালো’ এই বক্তব্যটি একাধিক ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে শেয়ার করে তার প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজসেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেছারী (এ বি জুবায়ের) তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘জাকাতের চেয়ে নাকি চাঁদাবাজি উত্তম! বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি গতকাল একটা টক শোতে এই বুলশিট বলেছেন। জাকাত একটা ফরজ ইবাদত, ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের একটা স্তম্ভ। আপনি মানেন বা না মানেন সেটা আপনার বিষয়, কিন্তু ইসলামের একটা মৌলিক উপাদানকে হিউমিলিয়েট করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?’
তাঁর এই পোস্ট প্রায় দেড় হাজার শেয়ার হয়েছে, মন্তব্য জমা পড়েছে প্রায় দুই হাজার। প্রতিক্রিয়া পড়েছে ৩৪ হাজারের বেশি।
নিলোফার চৌধুরীকে আক্রমণ ও কটাক্ষ করেও নানা পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘কয়দিন পর বলবে বিয়ের চেয়ে পতিতাবৃত্তি অনেক ভালো। খোদা! গালি কন্ট্রোল করার শক্তি দাও।’
তাঁর পোস্টটি ৬ লাখ ৬৯ হাজার বার দেখা হয়েছে। প্রতিক্রিয়া পড়েছে ৪৮ হাজারের বেশি। ৪ হাজারের বেশি মন্তব্য জমা পড়েছে। শেয়ার হয়েছে ৫ হাজার বার।
এই পোস্টের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ নামে একটি পাবলিক গ্রুপে জান্নাতুল মাওয়া নূর নামে এক অ্যাডমিন বিএনপির সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরীর বক্তব্যকে বিকৃত করে ১২টি ফটোকার্ড পোস্ট করেন।