‘নামসর্বস্ব’ বেসরকারি সংস্থা পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্টের (পাশা) এক কক্ষের কার্যালয়। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বরমপুর গ্রামে
‘নামসর্বস্ব’ বেসরকারি সংস্থা পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্টের (পাশা) এক কক্ষের কার্যালয়। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বরমপুর গ্রামে

অ নু স ন্ধা ন

এক ব্যক্তিনির্ভর ‘পাশা’ দিচ্ছে ১০ হাজার নির্বাচন পর্যবেক্ষক

নিজের বাসার একটি কক্ষকে তিনি বানিয়েছেন সংস্থার কার্যালয়। এটি সে অর্থে কার্যালয় নয়, মূলত সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ হুমায়ুন কবীরের বাসা। লোকবল বলতে তিনি একজনই। অথচ এই সংস্থা এবারের সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ১০ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক দিচ্ছে।

‘নামসর্বস্ব’ এই বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর নাম পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট (পাশা)। পাশার কার্যালয় হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বরমপুর গ্রামে। সৈয়দ হুমায়ুন কবীর নিজেই পাশার সর্বেসর্বা।

১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পাশাকে সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগ করার অনুমোদন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এবারের সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে অনুমতি পেয়েছে ৮১টি দেশি সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন। এর মধ্যে পাশারই আছে ১০ হাজার ৫৫৯ জন (মোট দেশি পর্যবেক্ষকের ১৯ শতাংশ)।

‘নামসর্বস্ব’ এই বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর নাম পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট (পাশা)। পাশার কার্যালয় হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বরমপুর গ্রামে। সৈয়দ হুমায়ুন কবীর নিজেই পাশার সর্বেসর্বা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাশার নিজস্ব কোনো কর্মী না থাকলেও তাদের ১২৭টি আসনে এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এমনিতে ‘স্বেচ্ছাসেবী’ এই সংস্থার নিজস্ব কোনো প্রকল্প নেই। অন্যান্য এনজিওর সহযোগী হিসেবে এটি কাজ করে। কিন্তু এবার ভোট পর্যবেক্ষণে তারাই সহযোগী হিসেবে অন্য এনজিওকে ‘নিয়োগ’ দিচ্ছে।

অন্য কোনো পর্যবেক্ষক সংস্থার অনুমোদিত পর্যবেক্ষকের সংখ্যা পাশার ধারেকাছেও নেই। পাশার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক পর্যবেক্ষক (৩ হাজার ৫৬১) অনুমোদন পেয়েছে কমিউনিটি অ্যাসিস্ট্যান্স ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (কার্ড)। আর এক হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক দিচ্ছে, এমন সংস্থা আছে ১৫টি।

স্থানীয় সংস্থাগুলো নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে চাইলে তাদের ইসিতে নিবন্ধিত হতে হয়। বর্তমান ইসি আগে নিবন্ধিত সব কটি পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন বাতিল করে নতুন করে নিবন্ধনের আবেদন আহ্বান করে গত বছরের ২৭ জুলাই। ৭ নভেম্বর প্রথম ধাপে ৬৬টি দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থাকে নিবন্ধন দেয় ইসি। সেখানে পাশার নাম ছিল না। এরপর ডিসেম্বরে পাশাসহ আরও ১৫টি সংস্থাকে নিবন্ধন দেয় ইসি।৮ ডিসেম্বর নিবন্ধন পাওয়া মোট ৮১টি সংস্থার তালিকা প্রকাশ করে ইসি।

ভোটের দিন ভোটার ও ইসির অনুমোদিত ব্যক্তিরা ছাড়া কেউ ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে পারেন না। অনুমোদিত হিসেবে পর্যবেক্ষকেরা ভোটকেন্দ্রে গোপন কক্ষ ছাড়া অন্য সব জায়গায় যাওয়ার সুযোগ পান। ভোট গণনার সময়ও তাঁরা থাকতে পারেন। সার্বিকভাবে নির্বাচন কেমন হলো, তা পর্যবেক্ষণ করে নির্বাচন শেষে ইসিতে লিখিত প্রতিবেদন দিতে হয় সংস্থাগুলোকে।

নিবন্ধিত সংস্থাগুলোই পর্যবেক্ষক মোতায়েনের পরিকল্পনা দিয়েছে। এতে কোনো রকম ব্যত্যয় মনে হয়নি, সে জন্য তাদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
আখতার আহমেদ, জ্যেষ্ঠ সচিব, ইসি সচিবালয়

পাশা সম্পর্কে যা জানা গেল

সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে নিবন্ধন নিয়েছিল ‘পাশা’। কাগজে–কলমে এই সংস্থার প্রধান কর্মসূচিগুলো হলো বৃক্ষরোপণ, যৌতুকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন ও বিনা মূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ। নিবন্ধনের পর থেকে এই সংস্থা কার্যকরী কমিটি অনুমোদনের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের কার্যালয়ে আবেদন করেনি।

পাশা নামের এই সংস্থা নিয়ে স্থানীয়ভাবে আছে নানা বিতর্ক। সরেজমিনে হবিগঞ্জে খোঁজ করে জানা গেছে, একসময় হবিগঞ্জ শহরে শায়েস্তানগর ও মোহনপুর এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে অফিস করেছিল পাশা। নারীদের চাকরি দেওয়ার নামে নানা অভিযোগ উঠলে এলাকাবাসীর প্রতিবাদে এ স্থান ছাড়তে হয় পাশাকে। এরপর কখনো চুনারুঘাট উপজেলা, আবার কখনো শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় অফিস খোলা হলেও কোথাও স্থায়িত্ব ছিল না কার্যালয়ের। এখন তাদের কার্যালয় বরমপুরে। অভিযোগ আছে, পাশা অতীতে অল্প টাকায় পর্যবেক্ষক কার্ড বিক্রি করেছিল।

পাশার কার্যালয় দেখতে চুনারুঘাটে

গত বুধবার চুনারুঘাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে বরমপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বরমপুর বাজারের পূর্ব দিকে একটি একতলা বাড়িতে ‘পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট (পাশা)’ নামে একটি সাইনবোর্ড লাগানো আছে। স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এটি পাশার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ হুমায়ুন কবীরের বসতবাড়ি। নিজের বাসার একটি কক্ষকে তিনি পাশার কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করেন।

দুপুর ১২টার দিকে ওই বাসার মূল ফটকে তালা ঝুলতে দেখা যায়। পাশে ছোট একটি দরজা। সেটিও বন্ধ। ভেতরে যাওয়ার জন্য ডাকাডাকি করেও কারও সাড়া পাওয়া গেল না।

পাশার নির্বাহী পরিচালক হুমায়ুনের প্রতিবেশী শফিকুল ইসলাম ও জুনায়েদ মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এটি বাড়ি হিসেবেই তাঁরা জানেন। পাশার সাইনবোর্ড লাগানো হলেও এখানে কোনো অফিসের কাজ হয় না। এ বাড়িতে হুমাযুন কবীর তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাস করেন।

বোঝা যাচ্ছে, পর্যবেক্ষক অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে যেভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন ছিল, ইসি সেটা করেনি।
বদিউল আলম মজুমদার, প্রধান নির্বাহী, সুজন

বরমপুর বাজারের ব্যবসায়ী কাদির মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘হুমায়ুন সাহেবের বাড়িতে আমরা পাশার একটি সাইনবোর্ড লাগানো দেখতে পাই। কিন্তু পাশা কী কাজ করে, সে বিষয়ে আমাদের ধারণা নেই।’

পাশাকে সাইনবোর্ড সর্বস্ব একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন হবিগঞ্জ জেলা সদরে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কাজ করা একটি এনজিওর পরিচালক। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, পাশার এনজিও পরিচালনা করার কোনো সরকারি (এনজিও ব্যুরো) অনুমোদন নেই।

চুনারুঘাট উপজেলা সদরের অনেকে পাশা সম্পর্কে জানেন। সেখানকার একজন বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, পাশা কয়েক বছর আগে চুনারুঘাট বাজারে একটি অফিস করে। ২০০১ সালে নির্বাচনে পাশা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ দল গঠন করেছিল বলে তাঁরা শুনেছেন। যাঁরা দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তাঁরা ৫০০ ও ১০০০ টাকা দিয়ে পর্যবেক্ষণ কার্ড সংগ্রহ করেছিলেন।

হুমায়ুন সাহেবের বাড়িতে আমরা পাশার একটি সাইনবোর্ড লাগানো দেখতে পাই। কিন্তু পাশা কী কাজ করে, সে বিষয়ে আমাদের ধারণা নেই।
বরমপুর বাজারের ব্যবসায়ী কাদির মিয়া

কোথায় কোথায় থাকবে পাশা

গত ২৬ জানুয়ারি গণভোট ও সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক নিয়োগের বিবরণী প্রকাশ করে ইসি। তাতে দেখা যায়, ৩০০ সংসদীয় আসনে ৪৭ হাজার ৪৫৭ জনকে পর্যবেক্ষণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পাশা ১২৭টি সংসদীয় আসনে ১০ হাজার ২৫০ জনের অনুমতি পেয়েছে। অবশ্য পাশার নির্বাহী পরিচালকের দাবি, তাঁর সংস্থা ১১৯টি আসনে ১০ হাজার ৭৯২ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করবে।

ইসি সূত্র জানায়, যেসব আসনে পাশা নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের অনুমোদন পেয়েছে, তার মধ্যে আছে লালমনিটরহাটের ৩টি, রংপুরের ৬টি, কুড়িগ্রামের ৩টি, গাইবান্ধার ৫টি, নওগাঁর ৬টি, রাজশাহীর ২টি, নাটোরের ৪টি, সিরাজগঞ্জের ২টি, পাবনার ৫টি, কুষ্টিয়ার ৩টি, যশোরের ৬টি, বাগেরহাটের ৩টি, খুলনার ৫টি, সাতক্ষীরার ৪টি, পটুয়াখালীল ৪টি, ময়মনসিংহের ১১টি, কিশোরগঞ্জের ৫টি, ঢাকার ২টি, সুনামগঞ্জের ১টি, সিলেটের ৬টি, মৌলভীবাজারের ৪টি ও হবিগঞ্জের ৪টি আসন।

তালিকায় দেখা গেছে, ৪১টি আসনে ১০০ বা তার বেশি পর্যবেক্ষক আছে পাশার।

সংস্থাটির সর্বোচ্চ ৩০৫ জন পর্যবেক্ষক থাকছেন মৌলভীবাজার-৩ আসনে। অবশ্য আরও কয়েকটি সংস্থারও কোনো কোনো আসনে ১০০–এর বেশি পর্যবেক্ষক আছেন।

মৌলভীবাজারের মোট আসন ৪। সব কটিতেই সর্বোচ্চসংখ্যক পর্যবেক্ষক আছেন পাশার। মৌলভীবাজার-১ আসনে মোট ৫টি সংস্থার ২৮৬ জন পর্যবেক্ষককে অনুমোদন দিয়েছে ইসি। এর মধ্যে ২৭৩ জনই পাশার পর্যবেক্ষক। মৌলভীবাজার-২ আসনে ৭টি সংস্থার ২৭৭ জন পর্যবেক্ষক থাকছেন। এর মধ্যে ২৪১ জনই পাশার। মৌলভীবাজার-৪ আসনে ১৫২ জনের মধ্যে ৯৬ জনই পাশার পর্যবেক্ষক।

৩০০ সংসদীয় আসনে ৪৭ হাজার ৪৫৭ জনকে পর্যবেক্ষণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পাশা ১২৭টি সংসদীয় আসনে ১০ হাজার ২৫০ জনের অনুমতি পেয়েছে। অবশ্য পাশার নির্বাহী পরিচালকের দাবি, তাঁর সংস্থা ১১৯টি আসনে ১০ হাজার ৭৯২ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করবে।

সিলেট, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আসনগুলোর চিত্রও অনেকটা একই। উত্তরাঞ্চলেও পাশার আধিক্য। যেমন লালমনিরহাট-১ আসনে ১০টি সংস্থার মোট ২৫৭ জন অনুমোদন পেয়েছেন। এর মধ্যে ১০০ জনই পাশার। নওগাঁ-১ আসনে ৮টি সংস্থার ১৮৫ জন অনুমোদন পেয়েছেন। এর মধ্যে ১৩৯ জন পাশার। নওগাঁর অন্য ৫টি আসনেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে।

পাশার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ হুমায়ুন কবীর প্রথম আলোকে বলেন, পাশা মূলত ক্ষুদ্রঋণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নারীদের নিয়ে বিভিন্ন এনজিওর সহযোগী হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে কোনো প্রকল্প তাঁদের হাতে নেই। যে কারণে এবার তাঁরা জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষকের কাজ করবেন।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণের খরচের বিষয়ে হুমায়ুন বলেন, ইসির নিবন্ধন পাওয়া সংস্থাগুলো বিভিন্ন দাতা সংস্থা, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে অর্থ চেয়ে আবেদন করেছে। তাঁরা অর্থ দিলে সেখান থেকে খরচ করা হবে। না হলে তাঁরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করবেন।

যাঁরা পর্যবেক্ষণে যাচ্ছেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবীর বলেন, কারও প্রশিক্ষণ নেই। তবে যাঁরা দলনেতা হবেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

পাশা পর্যবেক্ষক কার্ড বিক্রি করে—এমন অভিযোগের বিষয়ে হুমায়ুন কবীর বলেন, ভালো কাজ করলে সমালোচনা থাকবেই। তাঁরা সত্যের পক্ষে কাজ করেন। এতে কোনো সমালোচনা হলে তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না।

ইসির বক্তব্য

এবার প্রথম ধাপে মোট ৭৩টি সংস্থাকে নিবন্ধনযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে গত বছরের সেপ্টেম্বরে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল ইসি। তখন এর মধ্যে ৪৩টির কার্যালয়ে গিয়েছিলেন প্রথম আলোর প্রতিবেদকেরা। সে সময় দেখা গিয়েছিল, প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই ছোট ও সক্ষমতাহীন। কোনো ক্ষেত্রে নিজের বাসভবনকে, কোনো ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত ঘরকে এবং কোনো ক্ষেত্রে নির্মাণাধীন ভবনকে অফিস দেখিয়ে পর্যবেক্ষক হতে আবেদন করা হয়। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ৪৩টির মধ্যে ৭টি প্রতিষ্ঠানের উল্লিখিত ঠিকানায় গিয়ে কার্যালয় পাওয়া যায়নি। ৬টি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী নিজের বাসভবনকে অথবা একটি কক্ষকে ঠিকানা হিসেবে দেখিয়েছেন। ৫০ জন বা তার বেশি কর্মী পাওয়া গিয়েছিল মাত্র ৬টি প্রতিষ্ঠানে। অনেক ক্ষেত্রে এক কক্ষ, দুই কক্ষ নিয়ে ছোট কার্যালয় করে প্রতিষ্ঠান কোনো রকমে চলছে।

এ নিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এই ৭৩টি সংস্থার মধ্যে শেষ পর্যন্ত ৬৬টিকে নিবন্ধন দেয় ইসি।

নামসর্বস্ব সংস্থা পাশাকে বিপুলসংখ্যক পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের পরই সংস্থাগুলোকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। নিবন্ধিত সংস্থাগুলোই পর্যবেক্ষক মোতায়েনের পরিকল্পনা দিয়েছে। এতে কোনো রকম ব্যত্যয় মনে হয়নি, সে জন্য তাদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ইসি সচিব বলেন, ‘এখন আপনি যদি মনে করেন যে না তারা যথাযথ নয়। আপনি তথ্যটা দেন, আমি ব্যবস্থা নিতে পারি।’

অতীতেও পর্যবেক্ষক নিয়ে ছিল বিতর্ক

এর আগে ২০২৪ ও ২০১৮ সালের দুটি বিতর্কিত নির্বাচনে আবেদ আলীর ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম ও সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন নামে দুটি পর্যবেক্ষক সংস্থার ভূমিকাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১৮ সালের বিতর্কিত একাদশ সংসদ নির্বাচন শেষে ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম বলেছিল, তারা ২৩৯টি আসনের ১৭ হাজার ১৬৫টি কেন্দ্রে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে। সার্বিক বিবেচনায় নির্বাচন ‘খুবই শান্তিপূর্ণ, সুন্দর ও আনন্দঘন পরিবেশে’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সেই নির্বাচনে খুব বেশি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ছিলেন না। সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন কানাডার নাগরিক তানিয়া ফস্টারসহ বেশ কয়েকজন বিদেশি ‘পর্যবেক্ষককে’ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে নিয়ে এসেছিল। তাঁরা নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু হয়েছে বলে উল্লেখ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তানিয়া ফস্টার রয়টার্সকে অবশ্য ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছিলেন। প্রয়াত নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার এ বিষয়ে তাঁর বই নির্বাচননামায় লিখেছেন, ‘ভোটে একজন বিদেশি পর্যবেক্ষককে নিয়ে যা ঘটেছে, তাকে পর্যবেক্ষণ কেলেঙ্কারি আখ্যা দেওয়া যায়।’

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগেও ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে এনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এটি নিয়ে তখন ‘বিদেশি “পর্যবেক্ষকের” নামে আসলে কাদের আনা হচ্ছে’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছিল প্রথম আলো।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এতে বোঝা যাচ্ছে, পর্যবেক্ষক অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে যেভাবে যাচাই–বাছাই করা প্রয়োজন ছিল, ইসি সেটা করেনি। এ ছাড়া পক্ষপাতদুষ্ট কিছু সংগঠনকেও পর্যবেক্ষণের অনুমতি দিয়েছে বলে অভিযোগ আছে। ইসি কোন বিবেচনায়, কীভাবে পর্যবেক্ষক অনুমোদন করেছে, তা বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, এর আগে প্রার্থী বাছাইয়ে ও আপিলের ক্ষেত্রে ইসি শিথিলতা দেখিয়েছে। এসব ঘটনা ইসির সক্ষমতার ইতিবাচক প্রতিফলন নয়।