তারেক রহমান ও শফিকুর রহমান
তারেক রহমান ও শফিকুর রহমান

তারেকের আয় শেয়ার–জমা টাকা থেকে, শফিকুরের কৃষি

তারেক রহমানের সম্পদের মূল্য ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। শফিকুর রহমানের রয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকার সম্পদ।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০২৫-২৬ করবর্ষে আয় করেছেন ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। তাঁর আয়ের উৎস মূলত ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানত ও শেয়ার। 

জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমানের আয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ আয়ের উৎস কৃষি ও দান। 

বিএনপি ও জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতার হলফনামা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানা গেছে। তাঁরা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামা জমা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাদের ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশ করেছে। 

২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। তখন হলফনামায় প্রার্থীর বয়স, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়, সম্পদ, মামলাসহ আট ধরনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। এবার ১০ ধরনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যোগ করা হয়েছে আয়করের সর্বশেষ তথ্য ও নির্ভরশীলদের পেশার তালিকা। এ ছাড়া সম্পদের তথ্যে বিদেশে থাকা সম্পদের হিসাব উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 

হলফনামায় তথ্য দেওয়া ও প্রচার করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল এই চিন্তায় যে এর মাধ্যমে প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটাররা জানতে পারবেন। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়, সম্পদ ইত্যাদির তথ্য ভোটারদের ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে ভূমিকা রাখবে। 

তারেক রহমানের আয় ও সম্পদ 

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রার্থী হবেন। এ জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘরে উল্লেখ করেছেন, তিনি উচ্চমাধ্যমিক পাস। পেশা হিসেবে লিখেছেন রাজনীতি। তাঁর বয়স ৫৭ বছর। 

হলফনামা অনুযায়ী, তারেক রহমানের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় মোট ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে নগদ ও ব্যাংকে জমা টাকা, শেয়ার, সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু, আসবাব মিলিয়ে তাঁর অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকার মতো। 

অস্থাবর সম্পদের মধ্যে তারেক রহমানের ব্যাংকে জমা ও নগদ রয়েছে ৩১ লাখ ৫৮ হাজার টাকার কিছু বেশি। শেয়ার রয়েছে সাড়ে ৬৮ লাখ টাকার। ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রয়েছে ৯০ লাখ ২৪ হাজার টাকার কিছু বেশি। সঞ্চয়ী ও অন্যান্য আমানত রয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার। তাঁর আসবাবের মূল্য প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। সোনা ও অন্যান্য ধাতুর মূল্য ২ হাজার ৯৫০ টাকা (অর্জনকালীন)। 

অন্যদিকে স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে দুই একরের কিছু বেশি অকৃষিজমি, যার অর্জনকালীন মূল্য ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া ২ দশমিক ৯ শতাংশ উপহার পাওয়া এবং তার মূল্য অজানা বলে উল্লেখ করা হয়েছে তারেক রহমানের হলফনামায়।

হলফনামা অনুযায়ী, তারেক রহমানের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় মোট ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে নগদ ও ব্যাংকে জমা টাকা, শেয়ার, সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু, আসবাব মিলিয়ে তাঁর অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকার মতো। 

তারেক রহমান ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের নামে কোনো ঋণ নেই। তিনি ২০২৫-২৬ করবর্ষে আয়কর দিয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৪৫৩ টাকা। 

তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান চিকিৎসক। তাঁর ২০২৫-২৬ করবর্ষে আয় প্রায় ৩৫ লাখ ৬১ হাজার টাকা। তিনি আয়কর দিয়েছেন প্রায় ৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। আয়কর বিবরণী বা রিটার্নে তিনি সম্পদ দেখিয়েছেন ১ কোটি ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকার কিছু বেশি। এর মধ্যে ব্যাংকে জমা ও নগদ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, এফডিআরের পরিমাণ ৩৫ লাখ টাকা এবং সঞ্চয়ী আমানত ১৫ হাজার টাকা। তাঁর স্থাবর সম্পদ নেই। 

তারেক রহমানের নামে বর্তমানে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই। মামলাসংক্রান্ত তথ্যে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়, ২০০৪ সাল থেকে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মোট ৭৭টি মামলা ধাপে ধাপে নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে কোনোটি খালাস, কোনোটি প্রত্যাহার, কোনোটি খারিজ এবং কোনোটি থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। 

মামলাগুলোর বড় একটি অংশ দায়ের হয়েছিল ২০০৪, ২০০৭, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে। ২০০৭ সালের মার্চে জারি হওয়া জরুরি ক্ষমতা বিধিমালার আওতায় করা একটি মামলা ২০০৯ সালের ১৬ এপ্রিল খারিজ ও বেকসুর খালাসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। 

হলফনামা অনুযায়ী, তারেক রহমান সবচেয়ে বেশি ৪২টি মামলায় খালাস পেয়েছেন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে। এ ছাড়া ২০১৪ সালে একটি, ২০১৫ সালে তিনটি, ২০১৬ সালে আটটি, ২০১৭ সালে ছয়টি, ২০১৮ সালে চারটি, ২০১৯ সালে পাঁচটি, ২০২০ সালে একটি, ২০২১ সালে একটি এবং ২০২২ সালে পাঁচটি মামলায় খালাস পান তিনি। 

তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান চিকিৎসক। তাঁর ২০২৫-২৬ করবর্ষে আয় প্রায় ৩৫ লাখ ৬১ হাজার টাকা। তিনি আয়কর দিয়েছেন প্রায় ৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। আয়কর বিবরণী বা রিটার্নে তিনি সম্পদ দেখিয়েছেন ১ কোটি ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকার কিছু বেশি।

শফিকুর রহমানের সম্পদ

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসন (মিরপুরের একাংশ ও কাফরুল) থেকে নির্বাচন করবেন। তাঁর বয়স ৬৭ বছর। তিনি হলফনামায় বলেছেন, তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা এমবিবিএস পাস। বর্তমান পেশা চিকিৎসক। তাঁর স্ত্রী আমেনা বেগম গৃহিণী, যিনি অষ্টম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সদস্য ছিলেন। 

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের প্রায় দেড় কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। তাঁর নামে কোনো ঋণ নেই। ২০২৫-২৬ করবর্ষে তিনি ৩০ হাজার টাকা আয়কর দিয়েছেন। 

অস্থাবর সম্পদের মধ্যে শফিবুর রহমানের নগদ রয়েছে প্রায় ৬০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে প্রায় ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা। তাঁর বন্ড, ঋণপত্র, স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির শেয়ার রয়েছে প্রায় ২৭ লাখ ১৭ হাজার টাকার। 

শফিকুর রহমান একটি গাড়ির কথা উল্লেখ করেছেন, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তাঁর কাছে ১০ ভরি স্বর্ণালংকার রয়েছে, যার অধিগ্রহণকালীন মূল্য ১ লাখ টাকা। তাঁর ২ লাখ টাকার (অধিগ্রহণকালে মূল্য) ইলেকট্রনিক সামগ্রী রয়েছে। আরও রয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকার আসবাব। সব মিলিয়ে তাঁর অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১ কোটি ২ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। 

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের প্রায় দেড় কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। তাঁর নামে কোনো ঋণ নেই। ২০২৫-২৬ করবর্ষে তিনি ৩০ হাজার টাকা আয়কর দিয়েছেন। 

স্থাবর সম্পদের মধ্যে শফিকুর রহমানের কৃষিজমি রয়েছে ২১৭ শতক, যার অর্জনকালীন মূল্য ১৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা। অকৃষি ১৩ শতক জমির অর্জনকালীন মূল্য প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। ১১ দশমিক ৭৭ শতকের ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে জামায়াতের আমিরের; অধিগ্রহণকালে যার মূল্য ছিল ২৭ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে জামায়াতের আমিরের স্থাবর সম্পদের মূল্য ৪৭ লাখ ২৫ হাজার ৮৩৪ টাকা। 

শফিকুর রহমানের স্ত্রীর কোনো আয় নেই, কোনো সম্পদ নেই। তবে তিন সন্তানের আয়ের তথ্য তুলে ধরেছেন জামায়াতের আমির। এতে দেখা যায়, তাঁর এক মেয়ের ৫ লাখ টাকার, আরেক মেয়ের ১৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকার এবং ছেলে রাফাত সাদিক সাইফুল্লাহর ৩০ হাজার টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। 

জামায়াতের আমির ৩৪টি মামলার তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। এগুলোর মধ্যে বর্তমানে দুটি ফৌজদারি মামলা হাইকোর্টে স্থগিত রয়েছে। এ ছাড়া ২০০৮, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৭ ও ২০২২ সালে দায়ের করা ৩২টি মামলার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে ৩০টি হয়েছে ঢাকায়, ২টি সিলেটে। 

শফিকুর রহমানের স্ত্রীর কোনো আয় নেই, কোনো সম্পদ নেই। তবে তিন সন্তানের আয়ের তথ্য তুলে ধরেছেন জামায়াতের আমির। এতে দেখা যায়, তাঁর এক মেয়ের ৫ লাখ টাকার, আরেক মেয়ের ১৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকার এবং ছেলে রাফাত সাদিক সাইফুল্লাহর ৩০ হাজার টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। 

৩২টি মামলা থেকেই শফিকুর রহমান অব্যাহতি পেয়েছেন কিংবা মামলা খালাস বা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ১০ মামলায় অব্যাহতি, ৮টি প্রত্যাহার ও ১টিতে খালাস পেয়েছেন শফিকুর রহমান। ২০২৪ সালে ৬ মামলায় অব্যাহতি ও ৫টিতে খালাস পেয়েছেন তিনি। এ ছাড়া ২০১৭ সালে সিলেটে একটি মামলায় খালাস এবং ২০২১ সালে আরেকটি মামলায় অব্যাহতি পান জামায়াতের আমির। তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি মামলা করা হয়েছিল ২০১২ সালে, ২০টি। 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৩ সালে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়। ফলে ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নিয়েছিলেন শফিকুর রহমান। সেখানে তিনি পরাজিত হন। যদিও ওই নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত। 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রতীকসহ জামায়াতের নিবন্ধন পুনর্বহাল করা হয়। আগামী নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীরা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট করবেন। 

অভিযোগ আছে, বিগত নির্বাচনগুলোতে বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক প্রার্থী সম্পদের প্রকৃত তথ্য দিতেন না। হলফনামার তথ্য যাচাইও করা হতো না। যদিও হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিল এবং নির্বাচিত হওয়ার পরেও মেয়াদ থাকার মধ্যে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিধান রয়েছে।