ফারাক্কা লংমার্চ শুরুর আগে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহীতে সমাবেশে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী
ফারাক্কা লংমার্চ শুরুর আগে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহীতে সমাবেশে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী

ফিরে দেখা

কেমন ছিল মাওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চ

ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ কীভাবে বাংলাদেশের জন্য মরণফাঁদ হয়ে উঠেছে, তা বিশ্ববাসীর নজরে আনতে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে এক লংমার্চ শুরু করেছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। লাখো মানুষের অংশগ্রহণে সেই কর্মসূচি শুরু হয়েছিল রাজশাহী থেকে, পরদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে গিয়ে হয়েছিল শেষ। মজলুম জননেতা ভাসানী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা কাল পর্বে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছেন। তবে তাঁর ফারাক্কা লংমার্চকে স্মরণ করা হয় বিশেষভাবে। ১৬ মে ফারাক্কা লংমার্চ দিবস পালন করে অনেক সংগঠন।

‘মিছিলের আগে মাদ্রাসা ময়দানে জনসভা। ভাসানী এলেন নীল গাড়িতে চেপে। জনসমুদ্র গর্জে উঠল। খুব অল্প সময়ের জন্য তিনি বক্তৃতা করলেন। বহু সাংবাদিক, বহু ফটোগ্রাফার।’

মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চের জনসভার বর্ণনা এভাবেই তাঁর ‘পথ থেকে পথে’ বইয়ে দিয়েছিলেন চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন। সময়টি ১৯৭৬ সালের ১৬ মে। সেদিন সারা দেশ থেকে লাখো মানুষ রাজশাহীতে সমবেত হয়েছিলেন উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণ–প্রতিবেশকে বাঁচাতে। অভিন্ন নদী গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা ভারতের কাছ থেকে আদায়ের দাবিতে এই কর্মসূচি দিয়েছিলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি মাওলানা ভাসানী।

রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে এই লংমার্চ শুরুর খবরটি পরদিন দৈনিক ইত্তেফাকে এসেছিল এমন শিরোনামে—‘অঝোর বৃষ্টি ও হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করিয়া দুর্জয় জনতার দীপ্ত মিছিল’। দৈনিক বাংলার আট কলামের শীর্ষ প্রতিবেদনে শিরোনাম ছিল ‘পানির ন্যায্য হিস্যা চাই: লাখো জনতার দীপ্ত মিছিল এগোচ্ছে’। লংমার্চের উদ্দেশ্য জানাতে মাওলানা ভাসানীর বক্তব্য ধরে শিরোনাম করেছিল সংবাদ—‘গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ই মিছিলের উদ্দেশ্য’।

রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের কানসাট অভিমুখী দুই দিনের এই লংমার্চ শুরুর কিছুদিন আগেও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন মাওলানা ভাসানী। এই কর্মসূচি পালনের ৬ মাস পর ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর চিরবিদায় নেন তিনি। মজলুম জননেতা খ্যাত মাওলানা ভাসানী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কাল পর্বে নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছেন। তবে তাঁর ফারাক্কা লংমার্চকে স্মরণ করা হয় বিশেষভাবে।

ফারাক্কা ব্যারাজ : বাংলাদেশের মরণফাঁদ

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষের ভারতের সঙ্গে পানি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়। ভারত অব্যাহতভাবে যৌথ নদীগুলোর পানি প্রত্যাহার শুরু করলে শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যেতে থাকে এই অঞ্চলের নদীগুলো। বিভিন্ন সময়ে ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন জিয়াউর রহমানের সরকারের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও বিদ্যুৎমন্ত্রী বি এম আব্বাস। তিনি তাঁর ‘ফারাক্কা ব্যারাজ ও বাংলাদেশ’ বইয়ে লিখেছেন, পদ্মা নদী, যা ভারতের গঙ্গা নামে পরিচিত, তার পানি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয় ১৯৫১ সালে। ওই বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ সীমান্তের ১১ মাইল উজানে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কায় ব্যারাজ নির্মাণ করে ভাগীরথী–হুগলি নদীতে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের ভারতীয় পরিকল্পনার খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

ফারাক্কা ব্যারাজ

ভারত ১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানকে জানায় যে ফারাক্কায় ব্যারাজ নির্মাণ শুরু করেছে। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তখনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে এক চিঠিতে গঙ্গা সমস্যা নিয়ে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের জন্য অনুরোধ করেছিলেন।

এরপর গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বৈঠক হয়। এই আলোচনা বাধাগ্রস্ত করে তোলে ১৯৬৫ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ। অবশ্য যুদ্ধের পরেও পানিবণ্টন নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করে দুই দেশ। ১৯৭০ সালের জুলাইয়ে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, পাকিস্তানকে দেওয়া পানির পরিমাণ নির্ধারিত হলে সেটি ফারাক্কা দিয়ে সরবরাহ করা হবে। তবে এসব বৈঠক সীমাবদ্ধ ছিল সচিব পর্যায় পর্যন্তই। কারণ, ফারাক্কা ব্যারাজের নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তথ্য আদান–প্রদান সম্পূর্ণ হয়নি—এমন অজুহাতে ভারত কোনো কার্যকর আলোচনা হতে দেয়নি বলে অভিযোগ তখন থেকেই।

৯০ বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বেরিয়েই ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ফারাক্কা লংমার্চ শুরু করেছিলেন মাওলানা ভাসানী। রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট পর্যন্ত এই মিছিলের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন লাখো মানুষ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়। এদিকে এর মধ্যেই ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে ফারাক্কা ব্যারাজের নির্মাণকাজ শেষ হয়। ভারত ১৯৭৫ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশকে জানায়, ফারাক্কা ব্যারাজের ফিডার খালটি চালিয়ে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ভারত জানায়, তারা শুষ্ক মৌসুমের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত (৪১ দিন) ফারাক্কা ব্যারাজের ফিডার খাল দিয়ে গঙ্গা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি প্রত্যাহার করবে। পানি প্রত্যাহারের পরিমাণ সীমিত রাখা হয়। কারণ, বাংলাদেশ বলেছিল, উদ্দেশ্য যখন ফিডার খাল পরীক্ষা করা, তখন অল্প পরিমাণ পানি দিয়ে তা করা যেতে পারে।

বি এম আব্বাস লিখেছেন, পানি প্রত্যাহারের সম্মত সময়কাল ১৯৭৫ সালের ৩১ মে শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ভারত ফিডার খালের সর্বোচ্চ ক্ষমতা অনুযায়ী ফারাক্কায় গঙ্গার পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে। এভাবে গঙ্গার পানিবণ্টনের কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হয়ে যায়।

১৯৭৬ সালের ১৭ মের দৈনিক বাংলায় ফারাক্কা লংমার্চের খবর

ফারাক্কা নিয়ে ভাসানীর অবস্থান

সাংবাদিক–কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর ‘মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী’ বইয়ে লিখেছেন, ১৯৭৪ সাল থেকেই থেকেই মাওলানা ভাসানী ভারত কর্তৃক গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের প্রতিবাদ করে আসছিলেন। বাংলাদেশ ও ভারত সরকারকে এ ব্যাপারে তিনি বারবার তাগিদ দিচ্ছিলেন, এ সমস্যার সমাধান না হলে দুই দেশের মধ্যে অকৃত্রিম সম্পর্ক গড়ে উঠবে না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যার পর দেশে তখন সামরিক আইন জারি করা হয়েছে। বন্ধ ছিল সব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম। ১৯৭৬ সালের ১৮ এপ্রিল মাওলানা ভাসানী আকস্মিকভাবে ঘোষণা দেন, ভারত সরকার বাংলাদেশকে তার ন্যায্য পানি না দেয়, তাহলে ১৬ মে রাজশাহী থেকে লক্ষ জনতার শান্তি মিছিল ফারাক্কার অভিমুখে যাত্রা শুরু করবে।

ভাসানী বলেছিলেন, ‘ভারত সরকার কিছু না করুক, আমরা ভারতের ৬০ কোটি জনতার কাছে বিচার চাইব।’ তিনি স্লোগান তুললেন—‘চলো চলো ফারাক্কা চলো’।

১৯৭৬ সালের ১৭ মের দৈনিক সংবাদে ফারাক্কা লংমার্চের খবর

লংমার্চের প্রস্তুতি

লংমার্চ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ১৯৭৬ সালের ২ মে গঠিত হয় ‘ফারাক্কা মিছিল পরিচালনা জাতীয় কমিটি’। ৩১ সদস্যের এই কমিটির প্রধান ছিলেন মাওলানা ভাসানী। পরে এই কমিটির সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে ৭২ জন করা হয়।

অসুস্থতার কারণে বেশ কিছুদিন হাসপাতাল থাকার পর সেখান থেকে বের হয়েই লংমার্চের ঘোষণা দিয়েছিলেন মাওলানা ভাসানী। তখন তাঁর বয়স ৯০ বছর।

সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর বইয়ে লিখেছেন, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ‘ফারাক্কা মিছিল’ দেশে এবং বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই মিছিল উপলক্ষে বিদেশ থেকেও সাংবাদিকেরা আসেন।

ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি

১৮ এপ্রিল লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণার আগে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে একটি চিঠি লিখেছিলেন মাওলানা ভাসানী, যা লেখা আছে সৈয়দ আবুল মকসুদের বইয়ে। মাওলানা ভাসানী জানিয়েছিলেন, ফারাক্কা সমস্যা সমাধানে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে লংমার্চের কর্মসূচি অপরিবর্তিত থাকবে।

ভাসানী লিখেছিলেন, ‘আমরা চাই আপনাদের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব চিরকাল অটুট থাকুক। আপনাদের যেকোনো সমস্যায় সাহায্য করতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত এবং আপনাদের কাছ থেকেও আমরা এমনটাই প্রত্যাশা করি।’

এই চিঠির উত্তর পাঠিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। দীর্ঘ সেই চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘ভাবতেও অবাক লাগে, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যিনি আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করেছেন এবং পরবর্তীতে খোদ বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের দুঃখ-কষ্ট ও আত্মত্যাগের অংশীদার হয়েছেন, তিনিই আজ আমাদের এত চরমভাবে ভুল বুঝছেন। এমনকি আমাদের উদ্দেশ্যের সততা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন! “ভারত আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে অবিভক্ত ভারত প্রতিষ্ঠা করতে চায়”—এ মর্মে আপনার দেওয়া প্রকাশ্য বিবৃতি এবং “ফারাক্কা গুঁড়িয়ে দিতে” লংমার্চের নেতৃত্ব দেওয়ার যে হুমকি আপনি দিয়েছেন, সে সম্পর্কে আমি বরং এটাই বিশ্বাস করতে চাই যে আপনি উত্তেজনার বশবর্তী হয়েই কথাগুলো বলেছেন।’

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হন ইন্দিরা গান্ধী

ইন্দিরা গান্ধীর চিঠির জবাবে মাওলানা ভাসানী তাঁর স্থির সংকল্পের কথা জানিয়ে দেন। তিনি লেখেন, ‘আপনার চিঠিটি ফারাক্কা ইস্যুতে (ভারতের) সরকারি ভাষ্যেরই একটি পুনরাবৃত্তি মাত্র। মতিলাল নেহরুর নাতনি এবং পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর কন্যা হিসেবে আপনার কাছ থেকে আমি এমনটি আশা করিনি।’

ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা সেই চিঠিতে মাওলানা ভাসানী বলেন, ‘ফারাক্কা প্রসঙ্গে আমি আবারও আপনাকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলো সফর করার এবং আমাদের কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে কী বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা স্বচক্ষে নিরূপণ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি আপনাকে কেবল আপনার সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া প্রতিবেদনের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর না করার জন্য জোরালো আহ্বান জানাই।’

সৈয়দ আবুল মকসুদের লেখা বইটি

কেমন ছিল সেই দিন

তখন প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লাখ লাখ মানুষ সেদিন জড়ো হয়েছিলেন রাজশাহী শহরে। মাওলানা ভাসানী ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই মিছিল যাবে ‘রাজশাহী থেকে প্রেমতলী, প্রেমতলী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মনাকষা আর মনাকষা থেকে শিবগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত ৬৪ মাইল পথ।’

সৈয়দ আবুল মকসুদ মাওলানা ভাসানীকে নিয়ে লেখা বইয়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রার ‘ফারাক্কা মার্চ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেছেন। ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, অযুত কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে স্লোগান—‘চলো চলো ফারাক্কা, মরণ বাঁধ ফারাক্কা উড়িয়ে দাও।’ গঙ্গার পানির ওপর নিজেদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিযুত মানুষের মিছিল এগোচ্ছে। এ মিছিল ফারাক্কা মহামিছিল। এর নেতৃত্বে রয়েছেন শতাব্দী প্রবীণ মাওলানা ভাসানী। মিছিলের শুরু হয়েছে রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দান থেকে। শেষ সীমান্তের কাছাকাছি কানসাটে।

মিছিলের শুরুতে রাজশাহী ময়দানে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে মাওলানা ভাসানী বলেন, ‘গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।’ লাখ লাখ মানুষের উদ্দেশে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘এই মিছিল বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে মজলুমের সংগ্রামের প্রতীক। গোটা বিশ্বের বুক থেকে জালেমের শোষণ–পীড়নের সমাপ্তি না ঘটা পর্যন্ত এ সংগ্রাম চলবে।’

গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।
মওলানা ভাসানী, ১৯৭৬ সালের ১৬ মে, ফারাক্কা লংমার্চের ভাষণে

সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, ৬৪ মাইল লংমার্চে অংশগ্রহণকারী জনতাকে ভাসানী বলেন, ‘সকল প্রকার উসকানির মুখেও আমরা সীমান্ত অতিক্রম করবো না। আমরা শৃঙ্খলাবর্জিত জনগোষ্ঠী হিসেবে দুর্নামের ভাগী হতে চাই না। এই মিছিল শান্তিপূর্ণ অহিংস মিছিল।’

সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রতিবেদনে বলা হয়, মিছিলের শুরুতেই পুরোভাগে এসে দাঁড়ান মাওলানা ভাসানীসহ নেতৃবৃন্দ: মাওলানা ভাসানীও রয়েছেন। মিছিলের লোক কত? এ হিসাব দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এর যেন শেষ নেই। যেদিকে তাকানো যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। মিছিল যতই এগোচ্ছে—যোগ দিচ্ছে আরও মানুষ। উচ্চারিত হচ্ছে গণনবিদারী স্লোগান।

বিচিত্রার প্রতিবেদকের বর্ণনায়, মাদ্রাসা ময়দান থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে রাজশাহী কোর্ট। মিছিল এখানে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টির আগেই চারদিক ঝাপসা করে এল ধূলিঝড়। সকলের আশঙ্কা বুঝিবা মিছিল টিকল না। কিন্তু প্রকৃতি হার মানল জনতার কাছে।…প্রকৃতির ভ্রুকটি অগ্রাহ্য করে মিছিল চললো এগিয়ে।

মাওলানা ভাসানী তখন খোলা জিপ ছেড়ে গাড়িতে উঠেছিলেন। বিচিত্রার প্রতিবেদনে লেখা, বার্ধক্য আর অসুস্থতার জন্য তিনি আগের মতো পরিশ্রম করতে পারেন না। তবুও মিছিলের দিন সকাল থেকে তাঁকে দেখাচ্ছিল উৎফুল্ল আর নির্দিষ্ট লক্ষ্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মিছিল শুরু করার আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ‘মিছিল যাবেই, শেষ লক্ষ্য পর্যন্ত।’ একটি কথা, কিন্তু তাতে ছিল বড় আত্মপ্রত্যয়।

১৯৭৬ সালের ১৭ মের বাংলাদেশ টাইমসে ফারাক্কা লংমার্চের খবর

কানসাটের পথে

বিচিত্রার প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, রাজশাহী থেকে প্রেমতলী। ১১ মাইল পার হয়ে এসে প্রেমতলীতে মধ্যাহ্নকালীন বিরতি হয়। মিছিলকারীদের জন্য এখানে দেওয়া হবে চিড়া গুড়। মিছিল প্রেমতলীতে পৌঁছাল বেলা দুইটায়। মিছিলকারীরা গর্বিত। পথ হাঁটার ক্রান্তি ওদের নেই। প্রেমতলীতে স্বল্পকালীন অবস্থানের পর এরা রওনা দেবেন নবাবগঞ্জের পথে। এবারের যাত্রাপথ ১৯ মাইল দীর্ঘ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ তখন মহকুমা শহর, মহানন্দা নদীর তীরে এর অবস্থান। প্রেমতলী থেকে মিছিলের যাত্রা শুরু হয় বেলা তিনটার দিকে। তখন মেঘ কেটে গেছে, রোদ উঠেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জেই মিছিলের রাত্রিকালীন বিরতি হয়। তখনকার পরিস্থিতির বর্ণনায় সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রতিবেদনে লেখা হয়, এ শহরে আর ঠাঁই নেই। মানুষের ভিড়ে জায়গা নেই কোথাও। স্কুল, কলেজ সর্বত্র জায়গা করা হয়েছে মিছিলকারীদের থাকার জন্য। ওদিকে রান্না হচ্ছে খিচুড়ি। রাত বাড়ছে, বাড়ছে মিছিলকারীদের ভিড়। এখান থেকে পুনরায় যাত্রা শুরু হবে সোমবার ভোরে। সে যাত্রা শেষ লক্ষ্যে—কানসাটের দিকে।

মিছিলের শেষ দিনের বর্ণনায় প্রতিবেদনে লেখা হয়, নবাবগঞ্জ থেকে শিবগঞ্জ—পথের দুধারে ভিন্ন চিত্র। দুধারেই অযুত সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছেন অযুত জনতা। মিছিলকারীদের অভ্যর্থনা জানানোই এদের ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে রয়েছে পানিসহ বিভিন্ন খাবারের ব্যবস্থা। শান্ত আম্রকুঞ্জের নিচে সারি বেঁধে বসে আছেন গৃহবধূরা। দু–একজন আবার উৎসাহভরে পড়ছেন প্রচারপত্র।

১৯৭৬ সালের ১৭ মের ডেইলি অবজারভারে ফারাক্কা লংমার্চের খবর

দুপুরের মধ্যেই মিছিল পৌঁছে যায় কানসাটে। বিকেল সোয়া ৪টায় মাওলানা ভাসানী সেখানে মঞ্চে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার দাবি মেনে নিয়ে ফারাক্কা সমস্যার ন্যায়সংগত সমাধানে ভারত অস্বীকৃতি জানালে তিনি আগামী মাসের মধ্যে গঠিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী নিয়ে এ বছরের ১৬ আগস্ট থেকে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলন শুরু করবেন।

শান্তিপূর্ণ মিছিলের সমাপ্তি ঘোষণা করেন মাওলানা ভাসানী। এই কর্মসূচি ধরে সীমান্তে ভারতের পাহারা জোরদারের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশের দরিদ্র, নিরস্ত্র মানুষের ভয়ে ভারতকে যখন সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করতে হয়েছে, তখন তার অবিলম্বে ফারাক্কা সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা উচিত।’

সমাবেশের শেষে ‘বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ দুহাত তুলে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশ গড়ার কাছে আত্মোৎসর্গ করার শপথ গ্রহণ’ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মাওলানা ভাসানী।

১৯৭৬ সালের ১৮ মের দৈনিক আজাদে ফারাক্কা লংমার্চের খবর

এই কর্মসূচির শেষ নিয়ে পরদিন দৈনিক সংবাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘ভাসানীর ঘোষণা: গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের বাংলার মানুষ শেষ রক্তবিন্দু দিতে প্রস্তুত।’

দৈনিক বাংলার শিরোনাম ছিল ‘পানি না পেলে ভারতীয় পণ্য বর্জন’। বাংলাদেশ টাইমসের শিরোনাম ছিল ‘ফারাক্কা সমস্যার সমাধান না করলে ভারতের পণ্য বর্জনের আন্দোলন’।

ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল ‘১৬ই অগাস্টের মধ্যে ফারাক্কার সমাধান না হইলে প্রয়োজনে ইসলামী দুনিয়াকেও ভারতীয় পণ্য বর্জনের আহ্বান জানানো হইবে’।

এই লংমার্চের কর্মসূচি বিদেশি সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেয়েছিল। মাওলানা ভাসানীর মূল উদ্দেশ্য ছিল এই বিষয়ের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

লংমার্চ শেষে ওই বছরের ২৩ জুন মাওলানা ভাসানী আবার ইন্দিরা গান্ধীকে একটি চিঠি দেন। সেখানে তিনি বলেন, অফিসার পর্যায়ে এসব সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। ফারাক্কা ও সীমান্ত সমস্যা সমাধানে আপনি বাংলাদেশে আসুন এবং এর সমাধান খুঁজে বের করুন।

লংমার্চ থেকে চুক্তি

মাওলানা ভাসানীর লংমার্চের পর বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা সমস্যাটি বিশ্ববাসীর নজরে পড়ে। এরপর জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বিষয়টি তোলেন। জাতিসংঘ এটি দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির তাগিদ দেয়।

পরবর্তীকালে ১৯৭৭ সালে ভারতে মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে প্রথম অ-কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় এলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়ে। ওই বছরই দুই দেশের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টনে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

মাওলানা ভাসানীর লংমার্চের পর বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা সমস্যাটি বিশ্ববাসীর নজরে পড়ে। এরপর জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বিষয়টি তোলেন। জাতিসংঘ এটি দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির তাগিদ দেয়। ১৯৭৭ সালে দুই দেশের মধ্যে প্রথম পানিবণ্টন চুক্তি হয়। ১৯৯৬ সালে হয় ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি।

পানি ভাগাভাগির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিটি সই হয় ১৯৯৬ সালে, ৩০ বছর মেয়াদে। এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কার ফিডার ক্যানাল এবং পদ্মায় পানির হিস্যা নির্ধারণ করা। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিবছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফিডার ক্যানাল ও পদ্মা পর্যায়ক্রমে ১০ দিন করে ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তা পাবে।

এই চুক্তির শর্ত ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য ফারাক্কা ব্যারাজের ভাটিতে এবং বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকায় যৌথ মনিটরিং স্টেশন রয়েছে। সেখানে দুই দেশের প্রকৌশলীরা সার্বক্ষণিক নজরদারি করেন। তবে চুক্তিতে উল্লেখ করা পানি পরিমাণ অনুযায়ী না পাওয়ার অভিযোগ বরাবরই করে আসেছ বাংলাদেশ।

এই চুক্তির মেয়াদ এই বছরই (২০২৬) শেষ হয়ে যাচ্ছে। পদ্মায় পানিপ্রবাহের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে এই চুক্তি নবায়নের শর্ত বা এর ভবিষ্যৎ পরিণতির ওপর।

তথ্যসূত্র

  • ‘মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী’, সৈয়দ আবুল মকসুদ

  • ‘ফারাক্কা ব্যারাজ ও বাংলাদেশ’, বি এম আব্বাস

  • সংগ্রামের নোটবুক (সংবাদপত্র আর্কাইভ)

  • বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ)