
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলবের পর নিজের দুটি, বাবার পাঁচটি এবং মা ও স্ত্রীর একটি করে মোট নয়টি ব্যাংক হিসাবে থাকা প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ টাকার তথ্য প্রকাশ করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, আসিফের নিজের দুই অ্যাকাউন্টে আছে ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৫৫৬ টাকা। আর পরিবারের অন্য সদস্যদের অ্যাকাউন্টে মোট আছে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৪৭৮ টাকা।
আজ বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রকাশ করেন দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। তাঁর অভিযোগ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আসন্ন নির্বাচনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা সামনে আসার পর থেকে কিছু গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে তাঁর চরিত্র হননের জন্য অপপ্রচার চালাচ্ছে।
কোন হিসাবে কত টাকা
সংবাদ সম্মেলনে নিজের নামে দুটি ব্যাংক হিসাব থাকার কথা উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের একটি সেভিংস অ্যাকাউন্টে আছে ৯ হাজার ৯৩০ টাকা। আর সরকারে থাকা অবস্থায় একটি স্যালারি অ্যাকাউন্ট করেছিলেন। ১৬ মাসে গড়ে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা করে বেতন-ভাতা এবং পাঁচটি বিদেশ সফরের জন্য সরকারি টিএ-ডিএ বিলও এই হিসাবে এসেছে। এটি সব মিলিয়ে হবে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। এই অ্যাকাউন্টে বেতন-ভাতা মিলিয়ে মোট ক্রেডিট (জমা) হয়েছে ৮৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা আর ডেবিট (তোলা) হয়েছে ৭৬ লাখ ৩ হাজার টাকা। দুটি অ্যাকাউন্ট মিলিয়ে তাঁর এখন আছে মোট ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৫৫৬ টাকা।
আসিফ মাহমুদের বাবা পেশায় শিক্ষক। তাঁর নামে ব্যাংক হিসাব আছে পাঁচটি। আসিফ বলেন, ‘পাঁচ অ্যাকাউন্ট মিলে মোট ক্রেডিট (জমা) আছে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৭১১ টাকা। বাবা ১০ লাখ টাকার সার্ভিস লোন নিয়েছিলেন। এর জন্য প্রতি মাসে তাঁর বেতন থেকে একটি অংশ কেটে নেওয়া হয়। সার্ভিস লোন পেমেন্ট বাকি আছে ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪৬ টাকা। এই টাকাটা বাদ দিলে তিনি এখনো ৮২ হাজার ৩৫ টাকার মতো দেনায় আছেন।’ এর বাইরে মায়ের নামে একটি ব্যাংক হিসাবে ২১ হাজার ১৫৪ টাকা এবং স্ত্রীর নামে একটি হিসাবে ৬১৩ টাকা আছে বলে জানান আসিফ মাহমুদ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে যে তিনজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধি যুক্ত হয়েছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন আসিফ মাহমুদ। গত বছরের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে পদত্যাগের আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সম্পদের বিবরণী জমা দিয়েছিলেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই দিন আগে সরকারের প্রকাশিত সেই বিবরণী অনুযায়ী আসিফের সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৭১৭ টাকা। তখন অন্য উপদেষ্টারা নিজেদের পাশাপাশি স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করলেও আসিফ মাহমুদ শুধু নিজের সম্পদের তথ্য দিয়েছিলেন।
আজ ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রকাশের সময় আসিফ বলেন, ‘আমি যখন সরকার থেকে পদত্যাগ করি, তখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে আমার আয় ও সম্পদের সম্পূর্ণ বিবরণী পেশ করে এসেছি। তারপরও যেহেতু আবার এগুলো নিয়ে কথা উঠল এবং জল ঘোলা করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তাই আমার এবং আমার পরিবারের সবার ব্যাংক হিসাব জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া প্রয়োজন বলে আমার মনে হয়েছে।’
বিএফআইইউর ‘হীন উদ্দেশ্য’
আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া অভিযোগ করেন, গতকাল মঙ্গলবার বিএফআইইউ মোট ৫৬ জনের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করেছে। কিন্তু শুধু তাঁর তথ্য তলবের বিষয়টিই আলাদাভাবে সাংবাদিকদের নিয়ে থাকা একটি গ্রুপে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তাঁরা সত্যিকার অর্থে অনুসন্ধান করতে চাইলে করতেই পারেন। কিন্তু আমার বিষয়টা আলাদাভাবে নিউজ করতে বলা, গ্রুপে শুধু একজনেরটা দেওয়া—এগুলো শুধু অনুসন্ধানের বাইরেও তাঁদের হীন উদ্দেশ্য এবং চরিত্র হনন করাকেই স্পষ্ট করে।’
তাঁর বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচারের’ জন্য সরকারি দায়িত্বে থাকার সময় নানা কারণে মনঃক্ষুণ্ন হওয়া ব্যক্তি এবং গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে দায়ী করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘কিছু নির্দিষ্ট মিডিয়া থেকে, যাদের মালিকেরা প্রশ্নবিদ্ধ, তাদের থেকেই এ ধরনের চেষ্টাগুলো বেশি হচ্ছে। দায়িত্বশীল গণমাধ্যমগুলো এগুলো কাভার করছে না।’
সরকারের দায়িত্বে থাকতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে কাজ করেছেন উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘সামনের দিনেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করব—এটা আমাদের অঙ্গীকার।’
খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গও টানলেন আসিফ মাহমুদ
নিজের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের কথা বলতে গিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গও টেনেছেন এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ। গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে মিথ্যা বয়ান উৎপাদনের অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে পুরো মিডিয়া এস্টাবলিশমেন্টের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে প্রয়াত খালেদা জিয়াকেও এতিমের টাকা মেরে খাওয়ার উপাধি দিয়ে জেলে রাখা হয়েছিল। এ দেশে এগুলো সম্ভব। কিন্তু মানুষ জানে যে সেটা মিথ্যা ছিল এবং সেই ন্যারেটিভ সফল হয়নি এ দেশে।’
এ সময় তাঁর ব্যাংক হিসাব তলব সম্পর্কে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘এর মাধ্যমে একধরনের রহস্য তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে না জানি কী আছে! আমি আমার ও পরিবারের ব্যাংক হিসাব জনগণের সামনেই পরিষ্কার করে দিলাম, যাতে কোনো সন্দেহ না থাকে।’
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা মনিরা শারমিন, হুমায়রা নূর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।