বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে মহানন্দা। তীব্র শীত উপেক্ষা করে রাত পোহানোর আগেই তেঁতুলিয়ার বহু মানুষ বালু তুলতে নেমে পড়ে এই নদীতে। এটাই অনেকের জীবিকা। গতকাল রোববার সকাল আটটায়
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে মহানন্দা। তীব্র শীত উপেক্ষা করে রাত পোহানোর আগেই তেঁতুলিয়ার বহু মানুষ বালু তুলতে নেমে পড়ে এই নদীতে। এটাই অনেকের জীবিকা।  গতকাল রোববার সকাল আটটায়

পঞ্চগড়-১ আসন

‘কাকে ভোট দেব, ঠিক হবে আগের রাতে’

ঘন কুয়াশা, হাড় কাঁপানো শীত। এই শীতেও নদীতে মানুষ আর মানুষ। ফজরের নামাজের পরই নদীতে নেমেছেন তাঁরা। কোনো উৎসব নয়, তাঁরা এসেছেন পেটের তাগিদে, বালু তুলতে। নদীর নাম মহানন্দা। জায়গার নাম তেঁতুলিয়া।

মহানন্দা এখানে বাংলাদেশ আর ভারতকে আলাদা করেছে। পূর্বে এপারে তেঁতুলিয়া। আর ওপারে ভারতের জায়গার নাম মুড়িখোয়া ও বান্দরঝুলি। জানালেন স্থানীয় মানুষ ও সীমান্তের দায়িত্বে থাকা বিজিবি সদস্যরা।

প্রভাব না থাকলেও তেঁতুলিয়া রাজনৈতিকভাবে অতিগুরুত্বপূর্ণ স্থানের নাম। ‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয় সারা বাংলাদেশকে, সারা বাংলাদেশের মানুষকে বোঝানোর জন্য। এবারের নির্বাচনেও তাই পঞ্চগড় জেলার এই সীমান্তবর্তী এলাকার নাম উচ্চারিত হচ্ছে।

তেঁতুলিয়ায় উচ্চবিত্ত কম। অর্ধেক মানুষ মূলত মধ্যবিত্ত, এরা ধারকর্জ না করে সারা বছর চলতে পারে। বাকি অর্ধেকের বছর চলে শরীরের ওপরে। এদের পেশা মূলত তিনটি—কৃষি মজুরি, চা-বাগানে মজুরি ও মহানন্দা নদী থেকে বালু ও পাথর তোলা।

তেঁতুলিয়ার সরদারপাড়ার আজিজুর রহমানের বয়স ষাটের ওপর। তিনিও প্রতিদিনের মতো গতকাল রোববার ভোররাতে মহানন্দা নদীতে নেমেছেন বালু তুলতে। দশম শ্রেণিতে পড়া তাঁর ছেলে বাড়ি থেকে রুটি আর চা এনেছে। তখন সকাল আটটা। অনেক কথার পর নির্বাচনের প্রসঙ্গ উঠলে আজিজুর রহমান বলেন, এবার নির্বাচনে তিনি অবশ্যই ভোট দেবেন। জামায়াত ও বিএনপি—এই দুই দলের যেকোনো এক দলের প্রার্থীকে তিনি বেছে নেবেন। তবে এখনো মনস্থির করেননি। এখনো হাতে সময় আছে।

তেঁতুলিয়া পঞ্চগড়-১ আসনের মধ্যে। পঞ্চগড় সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী উপজেলা নিয়ে এ আসন। এখানে ভোটার ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৮০৭ জন। মোট প্রার্থী সাতজন। ভোটাররা মনে করছেন, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থী নওশাদ জমির ও এনসিপির প্রার্থী সারজিস আলমের মধ্যে। তবে কিছু ভোটারের কাছে জাসদ প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য নাজমুল হক প্রধানও গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী। নির্বাচনী প্রচার জমে ওঠা বলতে যা বোঝায়, তা এই সীমান্তে অনুপস্থিত।

তেঁতুলিয়া বাজারে প্রতিদিন দুধ বিক্রি হয়। বিক্রেতারা বড় বড় প্লাস্টিকের বোতলে বা ছোট ক্যানে করে দুধ নিয়ে আসেন বাজারে, নির্দিষ্ট স্থান আছে তাঁদের। এমনই দুজন বিক্রেতার সঙ্গে শনিবার রাত আটটার দিকে কথা হয়।

ভারত কোনো ব্যাপারই না

তেঁতুলিয়ায় উচ্চবিত্ত কম। অর্ধেক মানুষ মূলত মধ্যবিত্ত, এরা ধারকর্জ না করে সারা বছর চলতে পারে। বাকি অর্ধেকের বছর চলে শরীরের ওপরে। এদের পেশা মূলত তিনটি—কৃষি মজুরি, চা-বাগানে মজুরি ও মহানন্দা নদী থেকে বালু ও পাথর তোলা।

কোথাও মহানন্দা নদীর পুরোটা ভারতের মধ্যে, কোথাও অর্ধেক বাংলাদেশে, বাকি অর্ধেক ভারতে। সকাল নয়টা বাজতেই মহানন্দা নদী ফাঁকা হয়ে গেল। বিজিবির এ রকমই নির্দেশ আছে। একজন বালু ব্যবসায়ী বললেন, তিনি ১২ বছর ধরে বালুর ব্যবসা করছেন, ভারতের পক্ষ থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে কোনো বাধা দেখেননি।

তেঁতুলিয়া বাজারে একজন সবজি ব্যবসায়ী বললেন, একসময় ভারত থেকে মানুষ এসে গরু-মহিষ চুরি করে নিয়ে যেত। তাঁদের পরিবারের ১২টি মহিষ এক রাতে চুরি হয়েছে। এখন চুরি বন্ধ হয়েছে। কারণ, ভারত নিজেই কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে সীমান্তে। ভারতের নাগরিকদের সঙ্গে তেঁতুলিয়ার মানুষের এখন কোনো ঝামেলা হয় না।

তেঁতুলিয়া প্রেসক্লাবের একজন গণমাধ্যমকর্মী জানালেন, তেঁতুলিয়ার কোনো কোনো স্থানে তিন পাশেই ভারত। পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়া সড়কের কয়েক গজ পরেই ভারতের চা-বাগান। অনেকে বুঝতেই পারেন না, কোন অংশটুকু বাংলাদেশ, কোনটুকু ভারত। এখানে নির্বাচনের ইস্যুটা আসলে কী?

ট্যাক্সিচালক ইমরান হোসাইন ১৫ বছর ছিলেন সৌদি আরবে। দেশে ফিরে বসে না থেকে ট্যাক্সি চালিয়ে সংসারে সমৃদ্ধি আনার চেষ্টা করছেন। তাঁর সাফ কথা, উন্নয়ন, দুর্নীতি এসব আলোচনা অনেক হয়েছে। এখন দরকার পরিবর্তন।

ইস্যু যার যার মতো করে

তেঁতুলিয়ায় দুই দিনে অর্থাৎ শনি ও রোববার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ২৯ জন মানুষের সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা হয়

তেঁতুলিয়া প্রেসক্লাবে নির্বাচন নিয়ে কথা হলো এক গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে। তিনি বললেন, নির্বাচন এসেছে, নির্বাচন হবে। এখানে কোনো ইস্যু নেই। ইস্যু বিবেচনা করে ভোটাররা ভোট দেবেন না। তাঁরা বিবেচনা করেন দল বা প্রার্থী।

তেঁতুলিয়া বাজারে প্রতিদিন দুধ বিক্রি হয়। বিক্রেতারা বড় বড় প্লাস্টিকের বোতলে বা ছোট ক্যানে করে দুধ নিয়ে আসেন বাজারে, নির্দিষ্ট স্থান আছে তাঁদের। এমনই দুজন বিক্রেতার সঙ্গে শনিবার রাত আটটার দিকে কথা হয়। প্রতি লিটার ৬০ টাকা দামে দুধ বিক্রি করছেন তাঁরা। তখনো কিছু দুধ বিক্রি হতে বাকি। দুজন বন্ধুস্থানীয়। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। দুজনই আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেবেন বলে জানালেন।

তাঁদের একজন বললেন, যেই-ই জিতুক, গরিবের জন্য কেউ কিছু করবে না। দ্বিতীয়জন অতীতে দুটি ওষুধের কোম্পানিতে কাজ করেছেন। এখন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। তাঁর গরুর খামার আছে। তিনি বললেন, এবার ইস্যুটা ভিন্ন। ঠিক আগের মতো না। রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ বা ব্রিজ—এগুলো নির্বাচনের ইস্যু নয়। এবারকার ইস্যু ইনসাফ।

ভ্যানচালক ইসহাক আলী বলেন, ‘দেখা যাক, সময় তো আছে। যাকে মন চায় দিয়ে দেব।’

ট্যাক্সিচালক ইমরান হোসাইন ১৫ বছর ছিলেন সৌদি আরবে। দেশে ফিরে বসে না থেকে ট্যাক্সি চালিয়ে সংসারে সমৃদ্ধি আনার চেষ্টা করছেন। তাঁর সাফ কথা, উন্নয়ন, দুর্নীতি এসব আলোচনা অনেক হয়েছে। এখন দরকার পরিবর্তন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও তেঁতুলিয়ার মানুষের জন্য কোনো নির্বাচনী ইস্যু নয়। এখানে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা কম। রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসও নেই। সাধারণ মানুষ মনে করে, নির্বাচনের কারণে এলাকার শান্তি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কম।

মহানন্দা নদীর পারের বারোঘড়িয়া গ্রামের মকবুল হোসেন বলেন, ‘কাকে ভোট দেব, এখনো ঠিক করিনি। বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা হবে, আশপাশের লোকের সঙ্গে কথা হবে। কাকে ভোট দেব, ঠিক হবে আগের রাতে।’

তেঁতুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, হানাহানি, মারামারি না করার ঐতিহ্য আছে এখানে। নির্বাচনের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার কোনো ঝুঁকিও নেই। তারপরও সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি আছে পুলিশের।

আছে সবার মনে মনে

তেঁতুলিয়ায় দুই দিনে অর্থাৎ শনি ও রোববার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ২৯ জন মানুষের সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছি। তাঁদের মধ্যে আছেন ভ্যানচালক, অটো ও ট্যাক্সিচালক, শিক্ষার্থী, বালুশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, গৃহিণী, এনজিওকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমকর্মী। সবাই ভোট দেবেন বলেছেন।

তাঁদের মধ্যে দুজন শুধু স্পষ্ট করে বলেছেন কাকে ভোট দেবেন। একজন বলেছেন, তিনি জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থী এনসিপির সারজিস আলমকে ভোট দেবেন। কারণ, তাঁরা যা করতে চান, তা করার কথা আগে কেউ বলেননি। অন্যজন বলেছেন, তিনি বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দেবেন। কারণ, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক শক্তির কাছে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব থাকা উচিত। অনভিজ্ঞদের হাতে দেশ পরিচালনার ভার পড়লে মানুষের দুর্দশা বাড়বে।

কে কাকে ভোট দেবেন, তা আছে অধিকাংশ ভোটারের মনে মনে। কেউ বলেন, এখনই বলা উচিত হবে না। ভ্যানচালক ইসহাক আলী বলেন, ‘দেখা যাক, সময় তো আছে। যাকে মন চায় দিয়ে দেব।’

মহানন্দা নদীর পারের বারোঘড়িয়া গ্রামের মকবুল হোসেন বলেন, ‘কাকে ভোট দেব, এখনো ঠিক করিনি। বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা হবে, আশপাশের লোকের সঙ্গে কথা হবে। কাকে ভোট দেব, ঠিক হবে আগের রাতে।’