বিশ্লেষণ

সরকারি সংস্থা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, নাকি নেতাদের পুনর্বাসন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন দলের ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক আবদুল বারী। তবে মনোনয়ন তিনি পাননি। বিএনপি সরকার তাঁকে গত মাসে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান পদে বসিয়েছে।

দলের ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদককে নৌপরিবহনের দায়িত্বে থাকা একটি সংস্থার প্রধান পদে বসানোয় প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি সরকার কি দলের মনোনয়নবঞ্চিত অথবা পদবঞ্চিত নেতাদের সরকারি সংস্থাগুলোয় পুনর্বাসন করছে?

শুধু বিআইডব্লিউটিসি নয়, অন্তত ১১টি সরকারি সংস্থার প্রধান পদে বসানো হয়েছে দলের নেতাদের। এর বাইরে ৬৩টি জেলা পরিষদ এবং ১১টি সিটি করপোরেশনে দলের নেতাদের প্রশাসক পদে বসানো হয়েছে।

জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিবিদেরাই চেয়ারম্যান অথবা মেয়র পদে আসেন। কিন্তু সরকারি সংস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান অথবা ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ হয় না। সরকারই নিয়োগ দেয়।

দলের ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদককে নৌপরিবহনের দায়িত্বে থাকা একটি সংস্থার প্রধান পদে বসানোয় প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি সরকার কি দলের মনোনয়নবঞ্চিত অথবা পদবঞ্চিত নেতাদের সরকারি সংস্থাগুলোয় পুনর্বাসন করছে?

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডসহ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে রাজনীতিবিদদের বসানো হয়েছিল। পরে বিভিন্ন সরকারের সময় এমন নিয়োগ হয়েছে, তবে তা ছিল সীমিত পরিসরে।

বিএনপি সরকারের সময় এবার সরকারি সংস্থায় রাজনীতিবিদদের নিয়োগ দেওয়া বাড়ল। এটা নিয়ে একটি প্রশ্ন সামনে আসছে, সেটি হলো, বিএনপি কি যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পয়েল সিস্টেমকে’ অনুসরণ করে সরকারি সংস্থার পদে দলীয় লোক বসাচ্ছে?

‘স্পয়েল সিস্টেমে’ নতুন সরকার তাদের সমর্থক বা অনুগত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে অনুগতদের নিয়োগ বহুদিন ধরেই চলছিল। তবে ‘স্পয়েল সিস্টেম’ শব্দগুচ্ছটির ব্যবহার শুরু হয় ১৮১২ সালের দিকে। ১৯৩২ সালে নিউইয়র্কের মেয়র উইলিয়াম মার্সি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের সময়কার বিতর্কিত নিয়োগকে সমর্থন করতে গিয়ে ‘স্পয়েল’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে স্পয়েল সিস্টেমের কারণে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অদক্ষতা বেড়ে গিয়েছিল। ১৮৮৩ সালে পেন্ডলটন অ্যাক্টের মাধ্যমে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা চালু হয় এবং তাতে রাজনৈতিক নিয়োগ সীমিত হয়। অবশ্য নেদারল্যান্ডসের পাবলিক ম্যাটার্স নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পিটার ফন কিউলেন একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন, এখনো নতুন সরকার এসে যুক্তরাষ্ট্রে ৪ হাজারের মতো নিয়োগ দেয় রাজনৈতিকভাবে।

বিএনপি সরকারের সময় এবার সরকারি সংস্থায় রাজনীতিবিদদের নিয়োগ দেওয়া বাড়ল। এটা নিয়ে একটি প্রশ্ন সামনে আসছে, সেটি হলো, বিএনপি কি যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পয়েল সিস্টেমকে’ অনুসরণ করে সরকারি সংস্থার পদে দলীয় লোক বসাচ্ছে?

গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথমে বাছাই করা হয়। কাজটি করে ভাইস প্রেসিডেন্ট অথবা শীর্ষ কোনো নেতার নেতৃত্বাধীন কমিটি। কমিটির বাছাই তালিকা থেকে প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন দেন। মনোনীত ব্যক্তির নাম যায় সিনেট কমিটিতে। সিনেট কমিটি মনোনীত ব্যক্তিকে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করে। এর মাধ্যমে তাঁর দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাই করা হয়। পরে ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রার্থীকে চূড়ান্ত করা হয়।

দলের প্রতি কে কতটা ত্যাগ শিকার করেছেন, সরকারি পদ পেতে সেটি কোনো যোগ্যতা হতে পারে না। তিনি ওই পদে যেতে কতটা যোগ্য, বিগত সময়ে তাঁর এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা ছিল কি না, এসব দিক দেখা উচিত।

বাংলাদেশে বিএনপি সরকার নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আনুগত্যকে প্রাধান্য দিয়েছে। কিন্তু নিয়োগপ্রাপ্তদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাইয়ে কোনো শুনানি হয়নি; সংসদ বা দলের কোনো কমিটি যাচাই–বাছাই বা সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান মনে করেন, সাম্প্রতিক নিয়োগগুলো মূলত দলীয় ব্যক্তিদের পুনর্বাসন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দলের প্রতি কে কতটা ত্যাগ শিকার করেছেন, সরকারি পদ পেতে সেটি কোনো যোগ্যতা হতে পারে না। তিনি ওই পদে যেতে কতটা যোগ্য, বিগত সময়ে তাঁর এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা ছিল কি না, এসব দিক দেখা উচিত।

আমলাদের পুনর্বাসনকেন্দ্র

দেশে ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, ইনস্টিটিউট, করপোরেশন ইত্যাদির সংখ্যা ৩৫০টির বেশি। সাধারণত এসব দপ্তর বা সংস্থার প্রধান পদে নিয়োগ পান প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা।

অনেক দপ্তরের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবু এসব সংস্থা সরকার পুষে রাখে এবং সেগুলোকে আমলাদের পদায়ন ও পুনর্বাসনকেন্দ্র বলে গণ্য করা হয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারঘনিষ্ঠ আমলাদের সরকারি সংস্থার প্রধান পদে বসানো হতো। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে এসব সংস্থা বিশেষ কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। বরং সরকারি সংস্থাগুলোর অদক্ষতায় মানুষকে ভুগতে হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৩ সালে সরকার একটি প্রশাসনিক পুনর্গঠন কমিটি গঠন করেছিল। সাবেক সচিব এম নুরুন্নবী চৌধুরীর নেতৃত্বে ওই কমিটি ১৯৯৬ সালে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা ৩৫ থেকে ২২-এ নামিয়ে আনা এবং ৪৭টি সরকারি সংস্থা বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। এ সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ আর নেওয়া হয়নি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারঘনিষ্ঠ আমলাদের সরকারি সংস্থার প্রধান পদে বসানো হতো। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে এসব সংস্থা বিশেষ কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। বরং সরকারি সংস্থাগুলোর অদক্ষতায় মানুষকে ভুগতে হয়েছে।

এমন অবস্থায় বিএনপি সরকার আমলাদের বদলে সরকারি সংস্থায় রাজনীতিবিদদের নিয়োগ দেওয়া শুরু করল।

সরকার বিএনপি নেতাদের এক বছরের চুক্তিতে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় (গ্রেড-২) নিয়োগ দিয়েছে। এই পদে মূল বেতন ৬৬ থেকে ৭৬ হাজার ৪৯০ টাকা। বাড়িভাড়া ভাতা (ঢাকার জন্য) মূল বেতনের ৫০ শতাংশ। চিকিৎসায় দেড় হাজার টাকা, সন্তানপ্রতি ৫০০ টাকা শিক্ষাভাতা এবং ৯০০ টাকা আপ্যায়ন ভাতা রয়েছে। সার্বক্ষণিক গাড়িসুবিধা পান সংস্থার প্রধানেরা।

অবশ্য সংস্থাগুলোর কেনাকাটা, লেনদেন, প্রকল্প, বরাদ্দ ইত্যাদি ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান বা সংস্থাপ্রধানের বিপুল ক্ষমতা ও অনিয়মের সুযোগ থাকে। অতীতে সেই ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল।

দেখা গেছে, সব জায়গায় দলীয় নিয়োগ চলছে। ৫০টির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপি সরকার উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে। দলের অনুগত শিক্ষকদের বাইরে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

কোন সংস্থায় কারা নিয়োগ পেলেন

এক. বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাওয়া বিএনপির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক আবদুল বারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতি করার পর তিনি বিএনপির কমিটিতে স্থান পান।

বিআইডব্লিউটিসির সরকারের নৌপরিবহন করপোরেশন। অভ্যন্তরীণ, উপকূলীয় নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এবং যানবাহন পারাপারে ফেরি পরিচালনার কাজ করে সংস্থাটি। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৪–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে লোকসান দিচ্ছে।

দেশের নদীগুলোর ওপর যত সেতু নির্মিত হচ্ছে, বিআইডব্লিউটিসির গুরুত্ব তত কমছে। বিএনপির একজন নেতাকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংস্থা পুনর্গঠন এবং দলের ইশতেহার বাস্তবায়ন কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, সে প্রশ্ন উঠেছে।

দুই. যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি জাকির হোসেন সিদ্দিকীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত তাঁত বোর্ড সরকারের অগ্রাধিকারে কখনোই ছিল না। দেশে তাঁত ও তাঁতির সংখ্যা কমছে। তাঁত বোর্ড সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে তাঁত বোর্ডের ৪৯টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ৩৫টি বেসিক সেন্টার রয়েছে। এসব সেন্টার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাদের মূল কাজ তাঁতিদের ঋণ দেওয়া।

দেখা যাক সরকারি দপ্তর কারা ভালো চালায়, আমলারা নাকি রাজনীতিবিদেরা। যারা ভালো চালাবে, তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে।
বিপিএটিসির রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার

সরকার তাঁত ও তাঁতিদের নিয়ে বড় কোনো পরিকল্পনা করছে, সে জন্য তাঁত বোর্ডে দলের লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—বিষয়টি তেমন নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আগে সেখানে আমলাদের পুনর্বাসন করা হতো। এখন পুনর্বাসন করা হয়েছে একজন রাজনীতিবিদকে।

তিন. বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির পরিবেশ ও বনবিষয়ক সহসম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলামকে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়েছে। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। ছিলেন ছাত্রদলের সভাপতি।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০০৯ সালে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (সিসিটিএফ) গঠিত হয়। ট্রাস্ট ফান্ড পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আওতায় একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। এ তহবিল গঠনের পর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত রাজস্ব তহবিল থেকে চার হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত বছর ৪ নভেম্বর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জলবায়ু তহবিলের অধীনে অনুমোদিত ৮৯১টি প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ১১১ কোটি টাকা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় বা আত্মসাৎ হয়েছে।

চার. বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বেনজীর আহমেদকে। তিনি বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক।

উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য কমানো শিল্পায়নের লক্ষ্যে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে বিসিক নামে যাত্রা শুরু হয়। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিসিক প্রতিষ্ঠা করা হয়, তা অর্জিত হয়নি। বিসিক সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে বিসিকের মোট শিল্পনগরী রয়েছে ৮২টি। শিল্পপ্লটের সংখ্যা ১২ হাজার ৩৬০। বরাদ্দ করা প্লট ১১ হাজার ২৭১। বরাদ্দ করা প্লটের বিপরীতে শিল্পকারখানা রয়েছে ৬ হাজার ২০০টি।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বিসিকের অন্তত ১০টি প্রকল্পের কাজ চলমান। মোট ব্যয় প্রায় চার হাজার কোটি টাকা।

বেনজীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এখন সরকার চাইছে, বিসিক কার্যকর হোক। এ কারণে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

পাঁচ. বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের (বিজেসি) চেয়ারম্যান নিয়োগ পাওয়া মামুন হাসান বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ঢাকা-১৫ আসনে (কাফরুল-মিরপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। দল থেকে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে পাট ক্রয় ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে ১৯৮৫ সালের ১ জুলাই জুট করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে অব্যাহত লোকসান ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে ১৯৯৩ সালে বিজেসি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। সংস্থা বিলুপ্তির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ওই বছর গঠন করা হয়েছিল বিলুপ্তি সেল। কিন্তু ৩২ বছরেও বিলুপ্তি সেলের কাজ শেষ হয়নি। সম্পত্তি ভাড়া দেওয়া ছাড়া সংস্থাটির তেমন কোনো কাজ নেই।

বিজেসি সূত্র জানায়, সংস্থাটি গঠনের সময় এর প্রায় ৬৮৬ একর জমি ছিল। বিলুপ্ত ঘোষণার পর থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩৯১ একর জমি বিক্রি করা হয়েছে। ২০১২ সাল থেকে সম্পত্তি বিক্রি বন্ধ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ২৯৫ একর সম্পত্তি আছে। তার মধ্যে ১৯০ একর জমি বেদখলে। এসব সম্পত্তি উদ্ধারে বর্তমানে ২৮২টি মামলা চলছে। দখলে থাকা সম্পত্তির মধ্যে প্রায় ৬৭ একর জমি ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জুট করপোরেশনে দলীয় নিয়োগ পুনর্বাসন ছাড়া আর কিছু নয়। বিগত সরকারের সময়ে মামুন হাসান মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁকে সম্মান দেওয়ার জন্য এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ছয়. রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক। পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৯ সালে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে বর্তমান বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি দেশের অন্যতম প্রাচীন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। প্রতিবছর লোকসান দিয়ে আসছে সংস্থাটি।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বনজ সম্পদ যান্ত্রিক উপায়ে আহরণ করা, রাবারবাগান সৃজন, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচন করা এ প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য। যদিও যে উদ্দেশে প্রতিষ্ঠানটি করা হয়, সেটি তাঁরা করতে পারছে না। নতুন চেয়ারম্যান এ প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সাত. বাংলাদেশ শ্রমিককল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক করা হয়েছে সালাহ্উদ্দিন সরকারকে। তিনি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি।

আট. বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

৯. জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. কামরুজ্জামান।

১০. বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

১১. চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান। চিনিশিল্প করপোরেশন ধারাবাহিক লোকসান দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠান। ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত আগের ১০ বছরে সংস্থাটি লোকসান দিয়েছে ৭ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। ১৪টি চিনিকল এই সংস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। এসব চিনিকলের বিপুল জমি রয়েছে।

শামসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সব বন্ধ কারখানা চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। চিনিশিল্প করপোরেশনের আওতায় যেসব বন্ধ কারখানা রয়েছে, সেগুলো চালু করে লাভজনক করাই হবে তাঁর মূল লক্ষ্য।

এদিকে গত রোববার কুমিল্লা ওয়াসার নবগঠিত বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে আশিকুর রহমান মাহমুদকে (ওয়াসিম) তিন বছরের জন্য নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তিনি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।

কেন দলীয় নিয়োগ

বিএনপির নেতা ও প্রশাসনের বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলে মোটাদাগে তিনটি কারণ জানা যায়।

এক. বিগত সরকারের সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এসব নেতার অনেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কেউ মনোনয়ন পাননি, কাউকে দলের সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। এখন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পদে বসিয়ে তাঁদের গুরুত্ব দেওয়া হলো।

দুই. বর্তমান সরকার আমলাদের মধ্য থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ দিতে নিজেদের বিশ্বস্ত লোক পাচ্ছে না।

তিন. সরকারি এসব প্রতিষ্ঠান বিগত সময়ে আমলা দিয়ে পরিচালনা করলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। সে কারণে আমলাদের পরিবর্তে রাজনীতিবিদদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন বর্তমান কাঠামো দিয়ে সম্ভব নয় বলে তাঁর দল মনে করে। কারণ, সরকার যা চায়, সেভাবে সব হয়ে উঠছে না। তিনি বলেন, সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যাতে কাজে গতিশীলতা আসে।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন আছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সমাজকল্যাণ ইত্যাদি বেশি জরুরি। তাঁত বোর্ড বা জুট করপোরেশনের মতো সংস্থা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এসব সংস্থায় আমলাদের বদলে নেতাদের নিয়োগ আসলে পুনর্বাসন।

ইশতেহারে মেধা-যোগ্যতায় জোর

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পেশাদারত্ব বৃদ্ধি ও দলীয়করণ রোধ’ শিরোনামের একটি অনুচ্ছেদ রয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, বিগত দিনগুলোয় সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে। এ কারণেই ব্যক্তির বিশ্বাস-অবিশ্বাস এবং দলীয় আনুগত্যকে বিবেচনায় না নিয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে কেবল সততা, দক্ষতা, মেধা, যোগ্যতা, দেশপ্রেম ও অভিজ্ঞতার বিচার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রশাসন, পুলিশ এবং সব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে বিএনপি।

কিন্তু দেখা গেছে, সব জায়গায় দলীয় নিয়োগ চলছে। ৫০টির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপি সরকার উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে। দলের অনুগত শিক্ষকদের বাইরে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেখা যাক সরকারি দপ্তর কারা ভালো চালায়, আমলারা নাকি রাজনীতিবিদেরা। যারা ভালো চালাবে, তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে।’