ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। তবে গতকাল পর্যন্ত স্পষ্ট হয়নি—শুরুর বৈঠকে কে সভাপতিত্ব করবেন এবং নতুন সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার কে হচ্ছেন।
এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে আজ বুধবার সকালে অনুষ্ঠিত ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এ বৈঠক হবে। সেখানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্বের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। এ দুটি পদে ক্ষমতাসীন দল থেকেই সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তবে এবার ডেপুটি স্পিকারের পদটি বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। জামায়াতে ইসলামী এই পদটি নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে আজ বিরোধী দলের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, স্পিকার পদে দলের স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য আবদুল মঈন খান, হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুকের নাম আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে হাফিজ উদ্দিন আহমদের ব্যাপারে আলোচনা বেশি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। এর দেড় বছর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি।
সংবিধান অনুযায়ী, কোনো সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক আহ্বান করতে হয়। ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সে অনুযায়ী, আগামীকাল বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে শুরু হবে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন। সাধারণত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন দীর্ঘ হয়। এই অধিবেশন কত দিন চলবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি গঠনের পর কমিটির বৈঠকে প্রথম অধিবেশনের সময়কাল ঠিক হবে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সংসদের শীর্ষ পদগুলোতে অভিজ্ঞ ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুখ বসাতে চাইছে বিএনপি। স্পিকার পদে দলের স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য আবদুল মঈন খান, হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুকের নাম আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে হাফিজ উদ্দিন আহমদের ব্যাপারে আলোচনা বেশি।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, আজ বুধবার বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে নতুন স্পিকার নির্বাচনসহ অধিবেশনের শুরুতে কে সভাপতিত্ব করবেন, সব ঠিক হবে।
আগামীকাল বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে শুরু হবে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন। সাধারণত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন দীর্ঘ হয়। এই অধিবেশন কত দিন চলবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে কিছু নির্ধারিত কাজ হয়। এর মধ্যে প্রথম কাজ হচ্ছে, নতুন সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা। বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার প্রথম বৈঠকের শুরুতে সভাপতিত্ব করেন। তবে এবার এর ব্যতিক্রম হচ্ছে। কারণ, দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করার পর তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক (টুকু) কারাগারে।
এমন প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকের শুরুতে সভাপতিত্ব কে করবেন, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে কোনো সংসদ সদস্যকে এই দায়িত্ব দেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
সভাপতির সূচনা বক্তব্যের পর নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। এরপর তাঁদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি। এ সময়টাতে অধিবেশনে বিরতি থাকে। এরপর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে আবার অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হয়। সাধারণত নতুন স্পিকারকে স্বাগত জানিয়ে সংসদের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা বক্তব্য দিয়ে থাকেন।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকের শুরুতে সভাপতিত্ব কে করবেন, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে কোনো সংসদ সদস্যকে এই দায়িত্ব দেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে এবং বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিয়ে থাকেন। শোক প্রস্তাব গ্রহণের পর সংসদে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি। এরপর রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। অধিবেশনজুড়ে এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করেন সংসদ সদস্যরা।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদের প্রথম বৈঠকে উত্থাপন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে। উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ কোনো অধ্যাদেশ অনুমোদন না করলে সেটার কার্যকারিতা থাকবে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করে এরপর অনুমোদন করা হবে।
জামায়াতের তিনজন সংসদ সদস্য প্রথম আলোকে বলেছেন, ডেপুটি স্পিকার পদ নেওয়া হবে কি না, সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান কী হবে—এসব বিষয়ে আজ বুধবার বিরোধী দলের সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদে বলা হয়েছে, আইনসভা হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষ গঠিত হবে নিম্নকক্ষের ভোটের সংখ্যা অনুপাতে। উভয় কক্ষে বিরোধী দল থেকে একজন করে ডেপুটি স্পিকার মনোনীত করা হবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি একমত হলেও উচ্চকক্ষের গঠন পদ্ধতি নিয়ে তাদের ভিন্নমত রয়েছে। তবে দলটি ইতিমধ্যে সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদটি জামায়াতে ইসলামীকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
এ বিষয়ে জামায়াতের তিনজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে প্রথম আলো কথা বলেছে। তাঁরা বলেন, ডেপুটি স্পিকার পদ নেওয়া হবে কি না, সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান কী হবে—এসব বিষয়ে আজ বুধবার বিরোধী দলের সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
জামায়াতের একটি সূত্র বলছে, সংসদে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার পদ পাওয়ার নজির নেই। জুলাই জাতীয় সনদে প্রথমবারের মতো বিষয়টি স্থান পেয়েছে। জুলাই সনদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবে বিএনপির কোনো আপত্তি ছিল না। জাতীয় নির্বাচনের আগেও বিষয়টি কোনো আলোচনা ছিল না। তবে নির্বাচনের পর বিএনপি বলছে, বিরোধী দলকে এই পদ উদারতা হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। জামায়াত জুলাই সনদ অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকার নিতে চায়, বিএনপির অনুগ্রহ হিসেবে নয়।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে উচ্চকক্ষ এবং নিম্নকক্ষের দুটি ডেপুটি স্পিকার পদই জামায়াত পায়। এখানে অনুগ্রহের কিছু নেই। শোনা যাচ্ছে, জুলাই সনদের আলোকে এই দুটি পদ দেওয়া হবে, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চিঠি বা প্রস্তাব আসেনি।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, বিএনপিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। এরপর জামায়াত ডেপুটি স্পিকার বিষয়ে তাদের অবস্থান জানাবে। আজ বুধবার বিরোধী দলের বৈঠক থেকেও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।