জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ না দেওয়ায় নিজেকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার ইঙ্গিত করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। বড় মাছ মেজ বা ছোট মাছকে গিলে খাবে—গত দুই বছরে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। মাহফুজের এই প্রশ্নের পর এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় ‘ছোট মাছ-বড় মাছ’ প্রসঙ্গ৷
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আজ ৫ আগস্ট বুধবার বিকেলে ফেসবুকে ওই পোস্ট দেন মাহফুজ আলম। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এই নেতা এনসিপি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলটিতে যোগ দেননি। বর্তমানে তিনি ‘অল্টারনেটিভস’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্বে আছেন।
৫ আগস্ট উপলক্ষে দেওয়া ফেসবুক পোস্টে মাহফুজ আলম লিখেছেন, ‘মুক্তির দিনে এসে এসব বেমানান, তবু জানিয়ে যাই ইতিহাস এক মাছের পুকুর কিংবা বাজার! ইতিহাসের মাৎস্যনায় তো বাস্তব। বড় মাছ মেজো/ছোট মাছ গিলে খাবে। মেজো/ছোট মাছ আবার বড় হয়ে অন্যদের গিলে খাবে। গত দুই বছরে কি হয়নি এসব? আবারো হবে, সময় এলে সেখানে অন্যরা থাকবে না। আপনি একটি আদর্শিক গ্রুপের বিরোধিতা করলে আপনাকে ইতিহাস থেকে নাই করে দেয়া হবে। যেনবা আপনি ছিলেনই না। থাকলেও গাদ্দারবত ছিলেন। যদিচ, কোনোভাবে ঐ আদর্শিক গ্রুপের সাথে তাল মিলিয়ে চললে প্রধান ২/৪ পুতচরিত্রদের একজন হয়ে ওঠা কোন ইস্যুই ছিল না।’
মাহফুজ লিখেছেন, ‘একটি দলে যোগ না দিলে ঐ দলের লোকজন আপনার নামই নিবে না। যদিও দলটি গড়ে তোলায় আপনি প্রতিষ্ঠাতাদের কিংবা নীতিনির্ধারকদের একজন ছিলেন। দলের তৈরি কোন ইভেন্টের ইতিহাসেও আপনার নাম নেয়া হবে না। নিলেও দায় দেয়ার জন্য নেয়া হবে। যদিচ, আপনি ঐ ইভেন্টে সকল নীতিনির্ধারণে অন্যতম একজন ছিলেন। ফলে, যার হাতে ক্ষমতা সে ইতিহাস লিখবে। এটা নিয়ে অভিযোগ করবে দলের/আদর্শিক গোত্রের লোক। কারণ, দলের/আদর্শিক গোত্রের ক্ষমতারোহণের জন্য ইতিহাসের উপর কর্তৃত্ব দরকার। ক্ষমতারোহণ করে তারা কার/কাদের ইতিহাস লিখবেন, কাদের বাদ দিবেন সেটা বলাই বাহুল্য।’
এই পোস্টের পর মাহফুজের বিরুদ্ধেও ‘জাস্টিস’ (ন্যায়বিচার) না করার অভিযোগ তুলেছেন এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি তাহমিদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী। মাহফুজের পোস্ট শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, ‘আপনার আশেপাশে যতো ছোট মাছ ছিল, যারা পুরো জুলাইতে আপনার সাথে ছিল তাদের অনেকের সাথে আপনিও জাস্টিস করেন নাই। তাদের কাউকে নিয়েই আপনি পাবলিকলি (প্রকাশ্যে) কিছু বলেন নাই। অথচ, তাদের কন্ট্রিবিউশন (অবদান) আপনি ছাড়া কেউই জানে না!’
মাহফুজ আলমের পোস্ট শেয়ার করে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সালেহ উদ্দিন সিফাত লিখেছেন, ‘উনি (মাহফুজ) আমার মতো কতো ছোটো মাছকে ইতিহাস থেকে না-ই করে দিয়েছেন, সে আলাপ আর দিলাম না। ভালো থাকেন মাহফুজ ভাই। ক্ষমতার কুসুম কুসুম বিরোধিতার মধ্য দিয়ে ইতিহাস গড়তে থাকুন।’
‘বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়’
এনসিপির কয়েকজন নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়—এই আলোচনা মূলত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কৃতিত্বের প্রতিযোগিতা। মাহফুজ মনে করেন, এনসিপিতে যোগ না দেওয়ায় তাঁর কৃতিত্ব যথাযথভাবে স্বীকার করা হচ্ছে না। এনসিপিসংশ্লিষ্ট এবং এনসিপির বাইরে থাকা সাবেক সমন্বয়কদের মধ্যেও এ ধরনের অনুভূতি রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ আবার এর জন্য মাহফুজকেও দায়ী মনে করেন।
মাহফুজ আলমের ওই ফেসবুক পোস্টে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ৯ দফা ঘোষণা করে আলোচনায় আসা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের এবং আন্দোলনের এক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সাবেক সমন্বয়ক (বর্তমানে এনসিপির সহযোগী সংগঠন জাতীয় যুবশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক) রিফাত রশিদ মন্তব্য লিখেছেন। দুজনই বড়রা ছোটদের ‘গিলে খাওয়া’র বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
আবদুল কাদের মন্তব্য করেন, ‘সিনিয়ররা জুনিয়রদের গিলে খায়। নাই করে দেয়...৷’ জবাবে মাহফুজ লেখেন, ‘কারণ সিনিয়ররা একা হতে ভালোবাসেন। সবাইরে দিয়ে/নিয়ে বড় হতে তাদের অনীহা। এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত সবার করতে হচ্ছে, হবে।’
রিফাত রশিদ মাহফুজের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘আসলেই ইতিহাসের মাৎস্যন্যায় বাস্তব ভাই। বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়। কারণে অকারণে খায়।’ মাহফুজ তাঁকে জবাব দেন, ‘সবারই প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। করছি না এখন!! আরো ঘন হলে হয়ত এতটা প্রায়শ্চিত্ত লাগতো না।’