
ক্ষমতায় আসার দেড় সপ্তাহের মাথায় শুরু হওয়া ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বিএনপির সরকারের সামনে। যুদ্ধ ইতিমধ্যে চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে এবং এর শেষ হওয়ার লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ক্রমেই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যসহ অন্যান্য খাতেও সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা নতুন সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, যুদ্ধের অভিঘাত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা এখনো অনিশ্চিত। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সদ্য ক্ষমতাসীন সরকার কতটা প্রস্তুত, সেটিই এখন সব মহলে আলোচনার বিষয়।
সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামীকাল বুধবার জরুরি বৈঠকে বসছেন। সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক হওয়ার কথা। বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর মন্ত্রীরা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
এর আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রভাব মোকাবিলায় সরকার দ্রুত পদক্ষেপ হিসেবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও খাদ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। এই কমিটি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় কৌশল নির্ধারণ করবে।
৯ মার্চ কমিটি গঠনের দিনই অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। কাল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক বসছে কিছুটা বিস্তৃত পরিসরে। কারণ, যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা সরকারের ভেতরে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
এ ধরনের যুদ্ধ দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ভয়াবহ সংকটের সৃষ্টি করে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই যুদ্ধ কাম্য না। যুদ্ধ আমাদের মতো ছোট ও দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ভয়াবহ সংকটের সৃষ্টি করে, যা পরোক্ষ যুদ্ধ হয়ে যায়। অর্থনীতি অস্থিরতার মধ্য পড়ে যায়। আমরা মনে করি, এই যুদ্ধ একেবারেই অন্যায় যুদ্ধ। এর কোনো প্রয়োজন ছিল না। যারা এটি (যুদ্ধ) করছে, ইরানের ওপর আক্রমণ করছে, তারা আগ্রাসী ভূমিকা পালন করছে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এ সরকার মঙ্গলবার ৩৬ দিন পার করেছে। এই সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয়তা দেখিয়েছে সরকার। সংসদের সূচনায় সক্রিয়তা, মাঠপর্যায়ে খাল খনন, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও কৃষক কার্ডের মতো জনমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
সরকার গঠনের প্রথম মাসেই বেশ কিছু বড় কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন প্রকল্প। ১৬ মার্চ দিনাজপুর থেকে প্রধানমন্ত্রী এর উদ্বোধন করেন। একযোগে ৪০ জেলায় এর কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারে ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ও গির্জার যাজকদের জন্য মাসিক সম্মানী চালু করেছে সরকার। প্রথম ধাপে কয়েক হাজার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এই সুবিধার আওতায় এসেছেন।
কৃষি খাতে সহায়তা দিতে ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা পয়লা বৈশাখ থেকে শুরু হওয়ার কথা। প্রাথমিক পর্যায়ে টাঙ্গাইলের ১১ উপজেলায় ২১ হাজার ৫০০ কৃষককে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বছরে আড়াই হাজার টাকা প্রণোদনা দেওয়া হবে। এ ছাড়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে ৬ হাজার ৫০০ পরিবার এই সুবিধা পাচ্ছে। সরকার বলছে, এটি ধাপে ধাপে সারা দেশে সম্প্রসারিত হবে। একই সঙ্গে শিগগির ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব কর্মসূচি সরাসরি জনজীবনে প্রভাব ফেলবে। তবে এগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজন শক্ত অর্থনৈতিক ভিত। হঠাৎ ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব জনজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে পড়ছে, যা নতুন সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি হওয়ায় সরকার ইতিমধ্যে কিছু তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী স্পট মার্কেট থেকে চার কার্গো এলএনজি কেনার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা মজুত রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা এবং জ্বালানি তেল ক্রয়ে সীমা নির্ধারণের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, এসবই তাৎক্ষণিক কৌশল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়লে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ব্যয় সংকোচন বা অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে চলমান কর্মসূচিগুলোর ওপর।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রথম আলোকে বলেন, সংকট মোকাবিলায় সরকার তাৎক্ষণিক তিন ধরনের কৌশল নিয়েছে। এর অন্যতম হচ্ছে, বহুবিধ সূত্র থেকে গ্যাস ও জ্বালানি তেলসহ দরকারি পণ্য আমদানি এবং কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণসুবিধা গ্রহণ। তবে তিনি মনে করেন, সামাজিক কর্মসূচিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তাঁর দাবি, ‘সামাজিক সুরক্ষার নামে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতি ও ব্যাপক অপচয় করেছে। বিএনপির সরকার সামাজিক সুরক্ষার খাতগুলো এক-তৃতীয়াংশে নিয়ে আসবে। এর অপচয় বন্ধ করে সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে।’ সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আগামী বাজেটে কর হার বৃদ্ধি না করে বিগত সরকারের কর জালিয়াতি, কর অপচয় এবং ব্যক্তিবিশেষ ও গোষ্ঠীকে দেওয়া কর সুবিধা বন্ধ করে জনকল্যাণমুখী করব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম মাসে দেখা সক্রিয়তা এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে। যুদ্ধের অভিঘাত সামলে উন্নয়ন কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারাই হবে বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।