
আওয়ামী লীগের শাসনকালে ভোটাধিকারহীনতার কথা তুলে ধরে আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এই নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি সংঘাত-সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছেন তিনি।
কোনো গুজবে কান না দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের পর দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দায়িত্ব সমাপ্ত করবে তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দেড় বছর পর আগামী বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট, যা জুলাই সনদ অনুসারে সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নতুন পথের দিশা দেবে বলে আশা করছে অন্তর্বর্তী সরকার।
ভোটের দুই দিন আগে আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ নিয়ে আসেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, যা তিনি শুরু করেন মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করেন। তিনি শুরুতেই বলেন, জনগণের আত্মত্যাগ ছাড়া এই নির্বাচন ও গণভোট সম্ভব হতো না। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো ও দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হবে।
সপরিবার উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দিন। দেশের চাবি আপনার হাতে। সে চাবিটি সঠিকভাবে ব্যবহার করুন। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন। এবারের ভোটের দিন হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন।’
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণটি বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
‘বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে’
ভাষণে তরুণ ও নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গত ১৭ বছরে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও অনেকেই ভোট দিতে পারেননি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর সেই দিন এসেছে।
এই ভোটকে তরুণদের ‘প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ’ হিসেবে অভিহিত করেন মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ নয়, দাবি জানাচ্ছি, ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে—এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনো দিন হারাতে দেবে না।’
আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দিন। দেশের চাবি আপনার হাতে। সে চাবিটি সঠিকভাবে ব্যবহার করুনঅধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান উপদেষ্টা
ভোটদানের মাধ্যমে শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন নয়, একই সঙ্গে বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, ‘আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবারও পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব, এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট।’
রাজপথে নারীদের সমানভাবে সংগ্রামের কথা স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘(আপনারা) সন্তানদের ভবিষ্যৎ আগলে রেখেছেন, সমাজকে টিকিয়ে রেখেছেন, অথচ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নিজেদের মতপ্রকাশের সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত হয়েছেন। এই নির্বাচন আপনাদের জন্য এক নতুন সূচনা।’
‘রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করবে গণভোট’
জুলাই সনদকে জাতির ভবিষ্যৎ পথচলার এক ঐতিহাসিক দলিল ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা হিসেবে তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই সনদের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহি, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সমাজে সম–অধিকার নিশ্চিতকরণ—এসবের সফল বাস্তবায়ন এককভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মতামত।
এবারের গণভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে মন্তব্য করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণভোটে দেওয়া মানুষের প্রতিটি ভোট আগামী দিনের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করবে। এর প্রভাব থাকবে বহু প্রজন্মজুড়ে। এই ভোটের মাধ্যমেই মানুষ জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কারকাঠামোকে এগিয়ে নিতে চায় কি না, সেটি নির্ধারিত হয়ে যাবে। জনগণের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র কোন পথে অগ্রসর হবে, শাসনব্যবস্থা কোন কাঠামোয় গড়ে উঠবে এবং একটি নতুন বাংলাদেশ কীভাবে তার গণতান্ত্রিক ও মানবিক রূপ লাভ করবে। এর প্রভাব শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে পড়বে।
গুজব নিয়ে সতর্কবার্তা, দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি
অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না—এমন একটি অপপ্রচার চলার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এমন অপপ্রচারের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো গণতান্ত্রিক উত্তরণে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার দায়িত্ব সমাপ্ত করবে।
গুজব ও অপপ্রচারের বিষয়ে সতর্ক করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে নাগরিকদের মনে সন্দেহ, ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করা ও জনগণের আস্থাকে দুর্বল করাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। তবে তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা নাগরিকদের যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানান এবং নির্বাচন-সংক্রান্ত তথ্যের জন্য ৩৩৩ হটলাইনে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
কঠোর হওয়ার হুঁশিয়ারি
নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, তা মেনে নিতে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের ফলাফল যা–ই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিন। বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন।’
সেই সঙ্গে ভোটকেন্দ্র দখলসহ সংঘাত, সহিংসতায় উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তাও দেন প্রধান উপদেষ্টা।
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনারা দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্দেশ দিন, যেন কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল, ভোটে প্রভাব বিস্তার করা কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়। কেউ যেন সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনোভাবে গুজব না ছড়ায়। রাষ্ট্র কোনোভাবেই এ ধরনের আচরণ সহ্য করবে না।’
প্রশ্নবিদ্ধ বা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচন কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না বলে মন্তব্য করেন মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, একটি ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ বা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। বরং দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে। যারা জনগণের মতামত উপেক্ষা করে শক্তি ও অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে, তারা সবাই শেষ পর্যন্ত জনগণের আদালতে কঠিন জবাবদিহির মুখোমুখি হয়েছে।’
নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করতে ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুতি’
এবারের নির্বাচনে সার্বিক প্রচার-প্রচারণা পূর্ববর্তী যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করেন প্রধান উপদেষ্টা। এ জন্য তিনি রাজনৈতিক দল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, ভোটার, নির্বাচন কমিশন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এবং প্রচারণা চলাকালে কিছু সহিংস ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনো প্রাণহানি গ্রহণযোগ্য নয়।
মুহাম্মদ ইউনূস জানান, এবারের নির্বাচনে ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা এযাবৎকালের যেকোনো নির্বাচনের মধ্যে সর্বাধিক। এবার স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থী দুই হাজারের বেশি, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী চিত্র।
নির্বাচনের সময় নিরাপত্তায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও ব্যাপকভাবে দায়িত্বে রাখা হয়েছে।
প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো সারা দেশে ব্যাপক পরিসরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা শরীরের সঙ্গে সেঁটে রাখা ক্যামেরা (বডিক্যাম) ব্যবহার করছেন। নিরাপত্তা ও নজরদারিতে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার একমাত্র লক্ষ্য ভোটাররা যেন নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে ও সম্মানের সঙ্গে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
পাশাপাশি প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ এবং পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা চালু করার কথাও ভাষণে বলেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ভোটাধিকার কারও দয়া নয়; এটি সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।