সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। শুক্রবার রাতে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। শুক্রবার রাতে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে

জামায়াত আমিরের সংবাদ সম্মেলন

কিছু আসনে কারচুপি ও ভোটের পর বিভিন্ন স্থানে হামলার অভিযোগ

কিছু আসনে নির্বাচনের ফলাফলে কারচুপি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে গতকাল রাত থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যভুক্ত দলগুলোর নেতা–কর্মীদের বাড়িঘরে হামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এগুলোর প্রতিকার না পেলে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতের আমির।

রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শুক্রবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন শফিকুর রহমান। কিছু আসনের বিষয়ে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু জায়গায় কালকে নির্বাচনী সম্প্রচার যখন হয় তখন ফলাফল (ঘোষণা) দুই ঘণ্টা, চার ঘণ্টা লাপাত্তা। এগিয়ে আছেন তিনি হাজার হাজার ভোটে, শেষের দিকে গিয়ে তিনি ফেল, তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার হয়তো বা অল্প কিছু ভোটে, কষ্টমষ্ট করে তাঁকে ছাড় দিয়ে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে, যেটা অবাস্তব। আমাদের কাছে ডকুমেন্ট আছে, বিভিন্ন জায়গায় রেজাল্ট শিটের ওপর ঘষামাজা করা হয়েছে। কিছু কিছু আসনে দ্বৈত নীতি অবলম্বন করা হয়েছে।’

নির্বাচনে হারজিত থাকবে, এটা স্বাভাবিক উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘সেই হারজিতটা যদি স্বাভাবিকভাবে হয় তাহলে কারও সেখানে বড় কোনো আপত্তি থাকে না। সবাই সাধারণত মেনে নেয়। কিন্তু যদি সেখানে বড় ধরনের কোনো বৈষম্য অথবা ইরেগুলারিটিজ হয়ে থাকে, অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এটা প্রশ্ন তৈরি করে। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে গতকাল এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জানানোর পরেও আজকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ১১–দলীয় নির্বাচনী জোটের কর্মী, সমর্থক, এজেন্ট ও ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে হামলা হচ্ছে, ব্যক্তির ওপর হামলা হচ্ছে, আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাড়িতে।’

হুঁশিয়ারি দিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘নির্বাচনে যাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছেন, যেভাবেই পেয়ে থাকুন, এ ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট অবজারভেশন ও আপত্তি আছে, দায় মূলত তাঁদেরকেই নিতে হবে। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করা হবে—যদি তাঁরা সরকার গঠন করেন, এটা তাঁদের দায়িত্ব। কিন্তু এখন এগুলো কিসের আলামত? এখন এগুলো বন্ধ করতে হবে। এখনো যদি বন্ধ করা না হয়, আমরা বাধ্য হব যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে।’

কারসাজি করে প্রার্থীদের হারানোর অভিযোগ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর আসনের ব্যাপারে আপনারা সবাই জানেন। এটা আমাকে বড় করে আর বলতে হবে না সেখানে কী হয়েছে। সেন্টার দখল করে একজন নেতার আপনজনের নেতৃত্বে সেখানে যা হয়েছে, তার সাক্ষী এই দেশবাসী, বিশ্ববাসী।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওখানে যে কারণে অন্য একজনের পক্ষে ব্যালট অ্যাকসেপ্ট (গ্রহণ) করা হয়েছে, ঠিক একই কারণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের পক্ষে এটা অ্যাকসেপ্ট করা হয়নি। তো এক দেশে কি দুই আইন চলবে? নির্বাচন কমিশন কি একেক জায়গায় একেকটা আইনের প্রয়োগ করবে? একই বিষয়ে, এটা এখন বিশাল প্রশ্নের ব্যাপার।’

এ প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির আরও বলেন, ‘আমাদের সেক্রেটারি জেনারেলসহ বেশ কিছু আসনে এ ধরনের ব্যাপার আছে। নিজ নিজ আসনে যাঁদের ওপরে এই অন্যায় আচরণ করা হয়েছে, যাঁদের অধিকার জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, আমাদের সিদ্ধান্ত—তাঁরা প্রতিকার চাইবেন। সুনির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে যদি আমরা প্রতিকার পাই তাহলে এক কথা, কিন্তু যদি না পাই তাহলে এখানেও আমরা বাধ্য হব আমাদের পথে হাঁটতে। আমরা আশা করব, নির্বাচন কমিশনের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং তারা ন্যায় ইনসাফ করবে; না করলে দায় তাদের নিতে হবে।’

নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি জানিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আরপিও যেটা কাভার করে না, এ রকম যাঁরাই নির্বাচিত হয়েছেন, মেহেরবানি করে তাঁদের ফলাফল স্থগিত রেখে এ ব্যাপারে আগে সুরাহা করুন, তারপরে আপনারা আগান।...অনেকে ঋণখেলাপির তথ্য গোপন করেছেন। সেটাকে অবলীলায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। দৃষ্টি আকর্ষণ করা সত্ত্বেও ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। স্পষ্টভাবে এটা আরপিওর ভায়োলেশন (লঙ্ঘন)। আমরা সেই ভায়োলেশন দেখতে চাই না।’

‘১৬ জেলার ২১ স্থানে হামলা’

এদিকে শুক্রবার মধ্যরাতে জামায়াতে ইসলামীর অফিসিয়াল ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ১৬ জেলার কমপক্ষে ২১টি স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ তুলেছে দলটি।

জামায়াতের দাবি অনুযায়ী, খুলনায় অবস্থিত খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপাচার্যের (ভিসি) ওপর ছাত্রদল কর্মীরা হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া খুলনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বাড়িতে আগুন দেওয়া এবং তাঁর মা-বোনকে পিটিয়ে আহত করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ওই শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।

উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলা থেকেও সহিংসতা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। পঞ্চগড়ে বিএনপি কর্মীরা সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপি নেতা সারজিস আলম, যেখানে বেশ কয়েকজন আহত হন।

দিনাজপুরে জামায়াতের পোলিং এজেন্ট হওয়ায় ছেলের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বাবাকে মারধর ও বাড়ি পোড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে। কুড়িগ্রামে ভোট নিয়ে তর্কের জেরে জামায়াত নেতাকে কুপিয়ে জখম এবং লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বে বাড়িতে ঢুকে মালামাল লুটতরাজের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলায় শিবির কর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

ফেনী ও নোয়াখালী অঞ্চলেও হামলার অভিযোগ করেছে জামায়াত। ফেনীর ফুলগাজীতে ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে জামায়াত নেতার দোকানে হামলা এবং মুন্সীরহাটে জামায়াত কর্মীদের চারটি দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে। স্থানীয় যুবদল নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ প্রসঙ্গে ফেনী-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন। এ ছাড়া ফেনীতে বিএনপি প্রার্থীর জয়ের পর জামায়াত কর্মীদের বাড়িতে এবং নোয়াখালীর সেনবাগে জামায়াত নেতার ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলেও সহিংসতার কথা জানিয়েছে জামায়াত। উখিয়ার করম মুহুরীপাড়ায় বিএনপি কর্মীদের হামলায় বেশ কয়েকজন রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে ও সাবেক শিবির নেতার বাড়িতে এবং কক্সবাজারের চকরিয়ায় জামায়াত নেতার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে।

অন্যান্য জেলার মধ্যে বাগেরহাট-৪ আসনে আল-আমিন নামের এক যুবককে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে। এ ছাড়া বাগেরহাটে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের ওপর হামলায় কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। কুষ্টিয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতার বাড়িতে এবং সিরাজগঞ্জে জামায়াত আমিরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে জামায়াত অভিযোগ করেছে।

এ ছাড়া বরিশালে বাবার রাজনৈতিক (জামায়াত) পরিচয়ের জেরে ছেলের গাড়িতে হামলা, গোপালগঞ্জে বিএনপি নেতার নেতৃত্বে জামায়াত নেতার বাড়িতে হামলা এবং সুনামগঞ্জের দিরাই পৌরশহরে জামায়াত নেতার ওপর শারীরিক আক্রমণের অভিযোগ করেছে জামায়াত।