ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ

উচ্চকক্ষে পিআর না হলে ছাড় নয়, বিএনপির ওপর চাপ বাড়াবে ইসলামী আন্দোলন

ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (পিআর) ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে সোচ্চার থাকবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিএনপি সরকারের ওপর ‘চাপ’ তৈরির চেষ্টা করে যাবে দলটি।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের প্রাপ্ত ভোট ২ দশমিক ৭০ শতাংশ। ভোটের সংখ্যানুপাতিক হিসাবে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সর্বোচ্চ তিনটি আসন পেতে পারে দলটি।

জুলাই সনদ অনুযায়ী উচ্চকক্ষ গঠনসহ সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় তিনজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা মনে করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জন-আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণীত হয়েছে। তাই জুলাই সনদকে অবশ্যই সম্মান দেখাতে হবে এবং সনদ বাস্তবায়নের জন্য বিএনপি সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু জুলাই সনদের বিষয়ে বর্তমান সরকার যদি একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায়, সেটি জন-আকাঙ্ক্ষার বিপক্ষে যাবে।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন ২৫৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। এর মধ্যে শুধু বরগুনা-১ (সদর, আমতলী ও তালতলী) আসনে দলের প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ ১ লাখ ৪০ হাজার ২৯১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।

পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে শঙ্কা

ইসলামী আন্দোলন ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছে। দলের একমাত্র সংসদ সদস্য মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ গত বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টি জুলাই সনদে রয়েছে; কিন্তু এখন সনদ অনুযায়ী উচ্চকক্ষ গঠন না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের আমির শিগগিরই সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানাবেন।’

জুলাই সনদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকবে, যা নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) এবং উচ্চকক্ষ (সিনেট) সমন্বয়ে গঠিত হবে। নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত যেকোনো বিল উচ্চকক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করতে হবে।

তবে নিম্নকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত বা আপত্তি) রয়েছে। দলটি নিম্নকক্ষের আসনসংখ্যার অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের পক্ষে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিষয়টি এভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় জুলাই সনদ কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে সন্দিহান ইসলামী আন্দোলনের নেতারা। ১৭ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে দলটি মন্তব্য করেছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে বিএনপি জুলাই সনদে প্রাপ্ত জনরায়কে উপেক্ষা করেছে।

ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোকে বলেন, যে চারটি বিষয়ের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। অর্থবহ উচ্চকক্ষ গঠন করতে হলে সেখানে সব পক্ষের মতামত গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি যদি আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করার চিন্তা করে, তাহলে সেই উচ্চকক্ষ গঠনের প্রয়োজন নেই।

ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, তাঁরা চান না জুলাই সনদ নিয়ে নতুন সরকার বিক্ষোভের মুখে পড়ুক। কিন্তু সরকার যদি সনদকে পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ইসলামী আন্দোলন কোনো ছাড় দেবে না।

নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা

১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের তিন ভাই অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে এক ভাই ও দলের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ ও ৬ আসনে প্রার্থী ছিলেন। ভোটে বরিশাল-৫ আসনে তিনি দ্বিতীয় আর বরিশাল-৬ আসনে হয়েছেন তৃতীয়।

বরিশাল-৫ আসনে সৈয়দ ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৪ ভোট। এই আসনে ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার। আর বরিশাল-৬ আসনে ফয়জুল করীম পেয়েছেন ২৯ হাজার ১৪৬ ভোট। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খান ৮২ হাজার ২১৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।

বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে চরমোনাই পীরের আরেক ভাই সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫৩ ভোট। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী রাজীব আহসান ১ লাখ ২৮ হাজার ৩২২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।

পীরের আরেক ভাই মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ ঢাকা-৪ আসন থেকে নির্বাচন করেছেন। তিনি পেয়েছেন মাত্র ৬ হাজার ৫১৮ ভোট। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ৭৭ হাজার ৩৬৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।

নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করছে ইসলামী আন্দোলন। দলটির নেতারা মনে করেন, তাঁদের আরও ভালো করার কথা ছিল।

দলের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে ১৬ ও ২১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দুটি সভায় নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়। ভোটকেন্দ্র থেকে দলের এজেন্টদের বের করে দেওয়া, ফলাফলের তালিকায় কাটাকাটি, অকারণে ভোট বাতিলসহ বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে ওই দুটি সভায় আলোচনা হয়।

ভোট গণনা ও ফলাফল নিয়ে ‘মেকানিজম’ ছিল কি না, সেটিও পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে বলে জানান ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির চারজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। দলটির একজন যুগ্ম মহাসচিব ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন পুরোপুরি সুষ্ঠু হয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, নির্বাচনে ‘মেকানিজম’ হয়েছে। ভোটে অনিয়মের যেসব অভিযোগ উঠছে, দলের পর্যালোচনায় তার কিছু বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ভোটে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পর্যালোচনার পাশাপাশি তৃণমূলের নেতা–কর্মীদের ভূমিকা কেমন ছিল, সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে।